অশ্রুসিক্ত বিদায়, আর্জেন্টিনার জার্সি ছাড়ার আগে মেসির আবেগঘন বার্তা

অশ্রুসিক্ত বিদায়, আর্জেন্টিনার জার্সি ছাড়ার আগে মেসির আবেগঘন বার্তা

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির আবেগঘন বিদায়।

বুয়েনস আইরেসের ঐতিহ্যবাহী মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের গ্যালারিজুড়ে তখন নেমে এসেছে নীরবতা। মুহূর্ত পরপরই অবশ্য সেই নীরবতা ভেঙে গর্জে উঠছিল করতালি। মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি। মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা থাকলেও চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু যেন বলে দিচ্ছিল, আকাশি-সাদা জার্সিকে বিদায় জানানোর কষ্ট কতটা গভীর।

কোচ লিওনেল স্কালোনি, সতীর্থ ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, এনজো ফের্নান্দেসসহ মাঠে উপস্থিত হাজারো দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকার বিদায়ী বক্তব্য। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় জাতীয় দলের হয়ে পথচলার স্মৃতি, সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং আর্জেন্টিনার মানুষের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মেসি।

মেসি বলেন, জীবনের এই মুহূর্তে কথা বলা তার জন্য কঠিন। অনেক আবেগ ও স্মৃতি একসঙ্গে মনে পড়ছে। জাতীয় দলের জার্সি প্রতিনিধিত্ব করতে পারাকে তিনি নিজের জীবনের অন্যতম বড় সম্মান হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, কঠিন সময় এলেও তিনি কখনো লড়াই থামাননি এবং নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার অনুভূতিকে জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হিসেবেও বর্ণনা করেন তিনি।

মেসির ভাষায়, জাতীয় দলের হয়ে খেলা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। তবে তার কাছে মনে হয়েছে, সরে দাঁড়ানোর জন্য এটাই সঠিক সময়। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে খেলার মানসিক ও শারীরিক চাপের কথাও স্মরণ করেন তিনি।

সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা

জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ পথচলায় সতীর্থদের অবদানের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন মেসি। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমাসহ বিভিন্ন শিরোপা জয়ের পেছনে সতীর্থদের ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

মেসি বলেন, দলের প্রতিটি খেলোয়াড় আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়েছে। তাদের সঙ্গে মাঠ ও মাঠের বাইরে কাটানো মুহূর্তগুলো তার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। সতীর্থদের তিনি এমন একদল যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন, যাদের পাশে থাকলে যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করার আত্মবিশ্বাস পাওয়া যায়।

সমর্থকদের ভালোবাসা ভুলবেন না মেসি

আর্জেন্টিনার বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয় দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন মেসি। দেশের বিভিন্ন শহরে গিয়ে সমর্থকদের যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা সারাজীবন মনে রাখার কথা জানান তিনি।

বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকা—যে প্রতিযোগিতাই হোক, গ্যালারি ভরিয়ে সমর্থকদের উপস্থিতি তাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

বিশ্বকাপ জয়ের পর এই মাঠে ফিরে সমর্থকদের সঙ্গে উদযাপনের স্মৃতিও মেসির বক্তব্যে বিশেষ জায়গা পায়। সেই দিনের অভিজ্ঞতা কখনো ভুলবেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ওই মুহূর্ত তার, তার পরিবারের এবং আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

বিদায়ের পরও থাকবেন দলের পাশে

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে লড়াই করাটা তিনি খুব মিস করবেন বলেও জানান মেসি। তবে বিদায়ের পরও দলের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তরুণ খেলোয়াড়দের সমর্থন করার পাশাপাশি জাতীয় দলের প্রতি সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান মেসি। তার মতে, কঠিন সময় এলেই একটি দলের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায়। ঐক্যবদ্ধ থাকলে আর্জেন্টিনা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে।

মেসি সতীর্থদের উদ্দেশে বলেন, বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল প্রয়োজন। জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে যারা অপেক্ষা করে, তাদের সেই সুযোগ না দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

‘আমি আপনাদের খুব মিস করব’

ভাষণের শেষদিকে আরও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মেসি। ফুটবলের মাঠ ও জাতীয় দলের জার্সি ছেড়ে যেতে তার মন চাইছে না বলেও জানান তিনি।

মেসি বলেন, তিনি আর্জেন্টিনার মানুষ হতে পেরে গর্বিত এবং দেশ ও সমর্থকদের সঙ্গে নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরে ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ।

বিদায়ী বক্তব্যে সমর্থকদের উদ্দেশে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেসি বলেন, তিনি তাদের খুব মিস করবেন।

ভাষণ শেষ হওয়ার পর স্টেডিয়ামজুড়ে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরেন, আর গ্যালারিভর্তি দর্শক করতালি ও ভালোবাসায় বিদায় জানান আর্জেন্টিনার ফুটবলের অন্যতম বড় এই তারকাকে।