বাংলাদেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে চীনের আধিপত্য

বাংলাদেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে চীনের আধিপত্য

সংগৃহীত

ফুটবল, ক্রিকেটের ব্যাট-প্যাড-গ্লাভস থেকে শুরু করে ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট, জিমের ট্রেডমিল ও ওজন তোলার সরঞ্জাম—বাংলাদেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে চীনের তৈরি পণ্যের উপস্থিতি এখন সর্বত্র। রাজধানীর গুলিস্তান-পল্টনের দোকান থেকে বড় শোরুম, এমনকি পেশাদার প্রশিক্ষণকেন্দ্রেও বাড়ছে চীনা ক্রীড়াসামগ্রীর সরবরাহ।

বাংলাদেশ স্পোর্টস গুডস মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারের আকার বছরে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্যই আমদানিনির্ভর। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় বাকি অংশ।

আমদানি করা ক্রীড়াসামগ্রীর বড় অংশই আসে চীন থেকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক সংস্থা দ্য অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটি (ওইসি) প্রকাশিত ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ক্রীড়াসামগ্রী আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশের উৎস চীন।

ওইসির তথ্য বলছে, শুধু ২০২৪ সালে চীন থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪২৫ কোটি টাকার ক্রীড়াসামগ্রী আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ছিল জিম ও ফিটনেস সরঞ্জাম, ট্রেডমিল, ওয়েটলিফটিং বারবেল, হোম জিমের উপকরণ, ফুটবল, বাস্কেটবল, ইনডোর গেমসের সামগ্রী, ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিসের র‍্যাকেট এবং ক্রিকেট গিয়ার। ২০২৫ সালের তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি ওইসি।

বিশ্বকাপের জার্সিতেও চীনের দাপট

বাংলাদেশের বাজারে ফুটবল বিশ্বকাপের জার্সির বড় অংশও চীন থেকে আসে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের আগে পাঁচ মাসে ২৪টি দেশ থেকে বাংলাদেশে ২ লাখ ২২ হাজার জার্সি আমদানি করা হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ২ লাখ ১৭ হাজার জার্সিই এসেছে চীন থেকে। অর্থাৎ ওই সময়ে আমদানি করা জার্সির প্রায় ৯৮ শতাংশের উৎস ছিল চীন।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইমার্কের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্ব ফুটবল সামগ্রীর বাজারের আকার ছিল প্রায় ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এ বাজারে অ্যাডিডাস, পিউমা, নাইকি, ডিক্যাথেলন, ফ্রাঙ্কলিন ও ফরমেটিভের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ফুটবল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও চীন শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। এরপর রয়েছে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও জার্মানি।

দাম ও বৈচিত্র্যে চীনা পণ্যের চাহিদা

ব্যবসায়ীদের মতে, তুলনামূলক কম দাম, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং সহজলভ্যতার কারণে বাংলাদেশে চীনা ক্রীড়াসামগ্রীর চাহিদা বেশি।

গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেটের টি ওয়ার্ল্ড স্পোর্টসের বিক্রেতা কাউসার হোসেন বলেন, ‘আগে একটি ভালো মানের বিদেশি ফুটবল বা টেনিস র‍্যাকেট কিনতে সাধারণ ক্রেতাদের হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু এখন চীনা পণ্যের কারণে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে আকর্ষণীয় ডিজাইনের টেকসই ফুটবল বা গিয়ার পাওয়া যাচ্ছে।’

বাংলাদেশ স্পোর্টস গুডস মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম আর শামিম বলেন, স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা এখনো সীমিত এবং মূলত সাধারণ মানের ক্রিকেট ব্যাট ও ফুটবলের মতো কিছু পণ্যে তা কেন্দ্রীভূত।

তাঁর মতে, চীন সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক ও ডিজিটাল ক্রীড়া সরঞ্জাম সরবরাহ না করলে বাংলাদেশের ক্রীড়া খাতের আধুনিকায়ন আরও ধীরগতির হতে পারত।

আমদানির পাশাপাশি উৎপাদনের সম্ভাবনা

চীনের প্রযুক্তি, কাঁচামাল ও উৎপাদন দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে কারখানা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও দেখছেন ব্যবসায়ীরা। এতে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর বাজারকে উৎপাদনমুখী করা সম্ভব হতে পারে।

বিশেষ করে জার্সি, ক্রীড়া পোশাক, ব্যাগ, গ্লাভস এবং কিছু প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম উৎপাদনে বাংলাদেশের বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে চীনের উপস্থিতি শুধু আমদানির পরিমাণের হিসাব নয়। কম দামে পণ্য পাওয়ার সুযোগের পাশাপাশি এটি স্থানীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তি ও উৎপাদন দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে দেশেই ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনাকেও সামনে আনছে।