বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে দুই পথে এগোচ্ছে ব্যাংক, নজরে ৪৬ ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠী

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে দুই পথে এগোচ্ছে ব্যাংক, নজরে ৪৬ ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠী

সংগৃহীত

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে আইনি লড়াই জোরদার করছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো। সরকারি পর্যায়ে ফৌজদারি মামলা ও যৌথ তদন্তের পাশাপাশি বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ এবং পাওনা অর্থ পুনরুদ্ধারে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। প্রাথমিকভাবে ছয়টি ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪০টি গোষ্ঠীকে এর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৪৬টি ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীর বিদেশে থাকা সম্পদ ও ঋণের বিষয়টি পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে নির্বাচিত ছয়টি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত ৪০টি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ আরও প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।

প্রথম ধাপে কার্যক্রমের আওতায় এসেছে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গোষ্ঠী। বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রমাণ, ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতার অভিযোগ এবং বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এসব গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো এবার সম্মিলিতভাবে কাজ করার কৌশল নিয়েছে। প্রতিটি ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীর জন্য এক বা একাধিক প্রধান ব্যাংক নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ব্যাংক সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকের পক্ষে বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এ পর্যন্ত আটটি ব্যাংককে ছয়টি সম্মিলিত উদ্যোগের প্রধান ব্যাংক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।

এ কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হচ্ছে। বৈঠকে জানানো হয়, এখন পর্যন্ত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এ কাজে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গোপনীয়তা রক্ষা চুক্তি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কাজের অঙ্গীকারপত্রও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে।

অর্থ উদ্ধারের ব্যয় সামাল দিতে মামলাভিত্তিক অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ‘উদ্ধার না হলে পারিশ্রমিক নয়’ পদ্ধতিতে চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অর্থ বা সম্পদ উদ্ধার হলে প্রতিষ্ঠানগুলো পারিশ্রমিক পাবে। ফলে অর্থ উদ্ধারের আগেই ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্কের অগ্রিম ব্যয় বহন করার চাপ তুলনামূলকভাবে কমাতে পারবে।

দেওয়ানি কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশে স্থানান্তরিত সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করা, সেগুলোর ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং আদালতের মাধ্যমে সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করে ব্যাংকের পাওনা আদায়ের পথ তৈরি করা। এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশে থাকা জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, ট্রাস্ট এবং বিনিয়োগ তহবিলের তথ্য অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

ব্যাংকগুলোর এই উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও অর্থ পাচারসংক্রান্ত ফৌজদারি তদন্ত চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত পাচার করা সম্পদ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স এ কার্যক্রম সমন্বয় করছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে। এতে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও আর্থিক অপরাধ মোকাবিলার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্সের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে অবৈধ আর্থিক প্রবাহ শনাক্ত করা, পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদের বিষয়ে তদন্ত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং উদ্ধার করা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া।

টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীনে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলার তদন্তে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এসব দলের তদন্তের আওতায় রয়েছে এস আলম, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার, ওরিয়ন, নাবিল ও সামিট গোষ্ঠী, এইচবিএম ইকবাল, বসুন্ধরা গোষ্ঠী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলা।

যৌথ তদন্ত দলগুলো অর্থ পাচারের পদ্ধতি, অবৈধ সম্পদের উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং অপরাধের সঙ্গে সম্পদের সম্পর্ক নির্ণয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, বিও হিসাব, ব্যবসায়িক স্বার্থ, ট্রাস্ট ও বিনিয়োগ তহবিলের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত অর্থ পাচারসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধে ১৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলায় আদালতের রায় হয়েছে। এসব মামলায় ৭৬২ জনের বেশি সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া বা সম্পদ সরিয়ে নেওয়া ঠেকাতে ১৫৮ জনের ওপর বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির জন্য ১০টি অনুরোধও পাঠানো হয়েছে।

এ ছাড়া আদালতের আদেশে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ সংযুক্ত, জব্দ বা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এ ধরনের সম্পদের মোট মূল্য ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বলে বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে দেশীয় স্থাবর সম্পদের মূল্য ১০ হাজার ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, দেশীয় অস্থাবর সম্পদ ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা, বিদেশি স্থাবর সম্পদ ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং বিদেশি অস্থাবর সম্পদ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। তবে এসব সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার অর্থ এই নয় যে পুরো অর্থ ইতিমধ্যে উদ্ধার হয়ে রাষ্ট্র বা ব্যাংকের কাছে ফিরে এসেছে। সম্পদ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তা বাস্তবে পুনরুদ্ধার করতে হয়।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত ১৬টি দেশে ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। এসব অনুরোধের মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, অনুসন্ধান, নিয়ন্ত্রণ এবং পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া, হংকং ও চীনের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার উদ্যোগ, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশ কাজ করছে। এসব সহযোগিতার লক্ষ্য হলো আন্তঃসীমান্ত তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো, বিদেশে সম্পদের তথ্য সংগ্রহ এবং আইনি জটিলতা মোকাবিলা করা।

অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির বৈঠকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এবং পাচারকারীদের সম্পদ স্থানান্তর ঠেকাতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার সুপারিশ করেছে কমিটি।

তবে বিদেশে সম্পদ শনাক্ত করা, আদালতের মাধ্যমে তা জব্দ বা অবরুদ্ধ করা এবং সেই সম্পদ থেকে বাস্তবে অর্থ উদ্ধার—তিনটি আলাদা ধাপ। বিভিন্ন দেশের আইন, মালিকানা গোপন রাখার কৌশল, সম্পদের প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অর্থ ফেরত আনতে সময় লাগতে পারে। ফলে ব্যাংকগুলোর নতুন সম্মিলিত উদ্যোগ কতটা অর্থ উদ্ধার করতে পারবে, তা নির্ভর করবে তদন্তের অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।