আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : মঙ্গলবার ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ভাগ হওয়ার চার বছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথির এখনো কোনো হদিস মেলেনি। ২০২২ সালের আগস্টে ঢাকা বন্ড কমিশনারেট ভাগ করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট গঠনের সময় এসব নথি হস্তান্তর হয়নি। এর মধ্যে সরকারের বড় অঙ্কের নিরঙ্কুশ বকেয়া-সংক্রান্ত নথিও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে তেমন তৎপরতা না থাকলেও সম্প্রতি নথি উদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট। সরকারের পাওনা-সংক্রান্ত নথি খুঁজে বের করতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া আদায় নিয়ে সম্প্রতি ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে একটি বৈঠক হয়। সেখানে বকেয়ার হিসাব করতে গিয়ে ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। এসব নথির মধ্যে সরকারের বড় অঙ্কের পাওনা-সংক্রান্ত ফাইলও রয়েছে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা।
নথি খুঁজে বের করতে ঢাকা উত্তর বন্ডের সহকারী কমিশনার মো. রিদুয়ান সরদারকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই কর্মকর্তাকে কমিশনারেট ভাগের সময় হস্তান্তর না হওয়া নথির সন্ধানে মনিটরিংয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর বন্ডের কমিশনার ড. নাহিদা ফরিদী বলেন, এনবিআরের নির্দেশনায় রাজস্ব বাড়ানোর অংশ হিসেবে সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। সরকারের পাওনা খুঁজতে গিয়ে নথি না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। এরই মধ্যে নথির সন্ধানে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের আগস্টে বন্ড কমিশনারেট ভাগ হওয়ার পর ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের আওতায় আসে ২ হাজার ৬০৮টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট ১ হাজার ৭১৫টি প্রতিষ্ঠানের নথি উত্তর কমিশনারেটে হস্তান্তর করে। বাকি ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি হস্তান্তর করা হয়নি।
বিষয়টি জানিয়ে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে তৎকালীন উপকমিশনার চপল চাকমা এসব নথি চেয়ে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটকে দুই দফা চিঠি দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা দক্ষিণ বন্ডের তৎকালীন উপকমিশনার সাদিয়া আফরোজ উত্তর বন্ডের কাছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তালিকা চান। পরে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ বন্ডের তৎকালীন কমিশনার আহসানুল হক হস্তান্তর না হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিন নম্বরসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাঠানোর অনুরোধ করেন।
তবে এরপরও বিষয়টির কার্যকর সমাধান হয়নি। দীর্ঘ সময় দুই কমিশনারেটের মধ্যে চিঠি চালাচালি হলেও নথিগুলোর হদিস মেলেনি বলে সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘ সময় বিষয়টি কার্যত আড়ালে থাকার পর ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে নতুন কমিশনার যোগ দেওয়ার পর তা আবার সামনে আসে। এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় গত ১২ সেপ্টেম্বর সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া আদায় ও নথি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ওই বৈঠকে চার বছর ধরে ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। শুধু ঢাকা দক্ষিণ বন্ড থেকে হস্তান্তর না হওয়া নথিই নয়, ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটেও নিরঙ্কুশ বকেয়া-সংক্রান্ত অনেক ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা যায়।
এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, নথিগুলো কোথায় এবং সরকারের প্রকৃত পাওনা কত—তা যাচাই করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের শাখা সহকারীদের আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিজ নিজ শাখার সব নথির তথ্য হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এনবিআরে পাঠানো বৈঠকের কার্যবিবরণীতে প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া-সংক্রান্ত নথি হালনাগাদের পাশাপাশি সরেজমিনে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ বন্ডের কমিশনার মোহাম্মদ হাসমত আলী বলেন, ঢাকা উত্তর বন্ডের ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি হস্তান্তর না হওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই।
এনবিআর সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের বিভিন্ন দপ্তর পুনর্গঠন করে নতুন কর অঞ্চল, কাস্টম হাউস ও ভ্যাট কমিশনারেট গঠন করা হয়েছে। এসব দপ্তর ভাগের সময় বিভিন্ন ফাইল ও নথি হস্তান্তর নিয়ে অনিয়মের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের ৮৯৩টি নথি চার বছরেও উদ্ধার না হওয়াকে বড় ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজশে সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া-সংক্রান্ত নথি গায়েব হয়ে থাকতে পারে। এর সঙ্গে বন্ড কমিশনারেটের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত বা প্রমাণিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নথি না থাকলে প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের প্রকৃত পাওনা নির্ধারণ ও আদায় করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তারা আরও জানান, বন্ড ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন না থাকাও এ ধরনের অনিয়মের অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে বন্ড অটোমেশনের কথা বলা হলেও কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড ব্যবস্থাপনা এখনো চালু হয়নি। ফলে ইউপি জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
শুধু বন্ড কমিশনারেট নয়, কাস্টম হাউস ও ভ্যাট কমিশনারেটের ফাইল স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।