আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : সোমবার ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
আসিফ সালেহ, নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক।
দেশের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর সঞ্চয়ের বিপরীতে পাওয়া সুদের ওপর কর আরোপের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেছেন, যাঁদের গড় সঞ্চয়ের পরিমাণ এক লাখ টাকারও কম, তাঁদের ওপর নতুন করে করের বোঝা চাপানো হতাশাজনক।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে আসিফ সালেহ বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সঞ্চয়ের বিপরীতে অর্জিত সুদের ওপর বিগত বছরগুলোর কর দাবি করছে। এ কর নির্ধারিত সময়ে আদায় করা না হলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই তা পরিশোধ করতে হতে পারে বলে এনবিআরের চিঠিতে জানানো হচ্ছে।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী মূলত বাণিজ্যিক আমানতকারী নন। তাঁদের বড় একটি অংশ গ্রামের নারী। সপ্তাহে ১০, ২০, ৫০ কিংবা ১০০ টাকা করে অল্প অল্প করে তাঁরা সঞ্চয় গড়ে তোলেন। এই অর্থ অনেকের কাছে মেয়ের বিয়ে, ঘরের চাল পরিবর্তন কিংবা পরিবারের কোনো সদস্য হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার খরচ মেটানোর গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।
অল্প অল্প করে জমানো সেই অর্থের বিপরীতে যে সুদ তাঁরা পান, সেটিও তাঁদের সঞ্চয়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সেই সুদের ওপর কর আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্বল্প আয়ের মানুষের সঞ্চয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আসিফ সালেহ বলেন, বিষয়টি এমন একটি সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং অনেক পরিবারকে টিকে থাকার জন্য নিজেদের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ২০২৫ সালের জাতীয় জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে অতিদারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে।
জরিপের আয়-ব্যয়ের চিত্রও নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারের আর্থিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরে। জাতীয়ভাবে একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা। বিপরীতে মাসিক গড় ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য মাত্র ৭০ টাকা।
শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও চাপের বলে জরিপের তথ্য উল্লেখ করে আসিফ সালেহ বলেন, সেখানে পরিবারের গড় মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা হলেও ব্যয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। অর্থাৎ মাস শেষে আয় থেকে ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক পরিবারকে ঘাটতির মধ্যে চলতে হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ খাদ্য খাতে চলে যাচ্ছে।
আসিফ সালেহর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এই আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। আয় একই গতিতে না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। ফলে অনেক পরিবার তাদের পুরোনো সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদের ওপর কর আরোপের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ব্র্যাক। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে এই কর থেকে সরকারের প্রাপ্তি তুলনামূলকভাবে সামান্য হলেও এর প্রভাব পড়বে এমন মানুষের ওপর, যাঁদের আর্থিক সক্ষমতা সবচেয়ে সীমিত।
আসিফ সালেহ বলেন, ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের মধ্যে যাঁদের সঞ্চয়ের পরিমাণ সবচেয়ে কম, তাঁরাই অনেক সময় এই অর্থের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। ফলে তাঁদের সঞ্চয়ের বিপরীতে পাওয়া সামান্য সুদের ওপর কর আরোপ করলে তা তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি জানান, বিষয়টি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করার আশ্বাস পাওয়া গেলেও এরই মধ্যে বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কাছে এনবিআরের চিঠি আসতে শুরু করেছে।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্যে মূল উদ্বেগটি হলো—স্বল্প আয়ের মানুষ যখন সামান্য সামান্য করে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার জন্য সঞ্চয় গড়ে তুলছেন, তখন সেই সঞ্চয়ের বিপরীতে পাওয়া সুদের ওপর কর আরোপের উদ্যোগ তাঁদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই ক্ষুদ্র সঞ্চয় শুধু ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেনের বিষয় নয়; অনেক পরিবারের কাছে এটি জরুরি সময়ে টিকে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। তাই ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদের ওপর কর আরোপের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।