অনুমোদনের আগেই ৮০ শতাংশ কাজ শেষ, একনেকে উঠছে শ্রমিক সুরক্ষা প্রকল্প

অনুমোদনের আগেই ৮০ শতাংশ কাজ শেষ, একনেকে উঠছে শ্রমিক সুরক্ষা প্রকল্প

সংগৃহীত

প্রকল্প অনুমোদনের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়া তো দূরের কথা, সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভাতেই ওঠেনি প্রকল্পটি। অথচ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে প্রকল্পের মূল কাজের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। আড়াই বছর মেয়াদি প্রকল্পটির নির্ধারিত সময়সীমাও শেষের পথে। এমনকি প্রকল্প অনুমোদনের আগেই উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে করা অনুদান চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত পোশাক ও চামড়া খাতের শ্রমিক সুরক্ষা প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘দ্য ইমপ্রুভড ওয়ার্কিং কন্ডিশন অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ফর ওয়ার্কার্স ইন দ্য টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার সেক্টর’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। জার্মান সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জিআইজেডের অনুদানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

মেয়াদ শেষের পথে, এখনো অননুমোদিত

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সে হিসাবে আড়াই বছর মেয়াদি প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হতে বাকি রয়েছে মাত্র কয়েক মাস।

অর্থাৎ প্রকল্পের প্রস্তাবিত মেয়াদের অধিকাংশ সময় পার হয়ে যাওয়ার পর সেটি একনেকের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, একনেক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম শুরু করার কথা। তবে এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আগেই প্রকল্পটির বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয় এবং এর বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

ডিআইএফইর এক কর্মকর্তা জানান, একনেক থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না মিললেও প্রকল্পের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে স্টাডি পরিচালনা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি এবং প্রায় সাড়ে ৮ লাখ শ্রমিকের ডাটাবেজ তৈরির মতো কার্যক্রম রয়েছে।

চুক্তির মেয়াদও শেষ

প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার ও জিআইজেডের মধ্যে ৭ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার অনুদান নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভায় প্রকল্পটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় টিএপিপির বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

সাধারণত এসপিইসি সভার পর দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সংশোধিত টিএপিপি জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা করতে শ্রম মন্ত্রণালয় ও ডিআইএফইর প্রায় ১৪ মাস সময় লাগে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুনর্গঠিত টিএপিপি পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়।

ততদিনে জিআইজেডের সঙ্গে মূল অনুদান চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ থেকে চলতি বছরের ৯ মার্চ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে অনুদান চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং হালনাগাদ তথ্য দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক জবাব নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।

দেরির কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য

প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, জিআইজেডের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, পরিকল্পনা কমিশনের আর্থিক হিসাব ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংশোধন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নথিপত্র সংশোধনের কারণে সময় লেগেছে।

তবে পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি অনুদানভিত্তিক কারিগরি প্রকল্পের টিএপিপি পুনর্গঠনে ১৪ মাস সময় নেওয়া প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয়টি সামনে আনে।

ডিআইএফইর অর্থ ও পরিকল্পনা অধিশাখার যুগ্ম মহাপরিদর্শক মো. হাসিবুজ্জামান বলেন, আগে বৈদেশিক অনুদানের কারিগরি প্রকল্পের ক্ষেত্রে টিএপিপি অনুমোদনের বিষয়ে এতটা কড়াকড়ি ছিল না। উন্নয়ন সহযোগীরা অনেক সময় নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কাজ শুরু করত। তবে পরিকল্পনা কমিশন সম্প্রতি এ বিষয়ে কঠোর হওয়ায় অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, টিএপিপি পুনর্গঠনে বিলম্বের পেছনে মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি ছিল না। জিআইজেডের নিজস্ব দাপ্তরিক প্রক্রিয়া এবং বারবার প্রস্তাব পরিমার্জনের কারণেই সময় লেগেছে।

হাসিবুজ্জামান আরও বলেন, আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আগেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অনুমোদন নিয়ে প্রকল্পের কিছু বাস্তব কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অনুদান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়াও ইআরডিতে চলমান রয়েছে।

শ্রমিকদের জন্য কী থাকছে

প্রকল্পটির আওতায় দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা, কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার উপসচিব মো. আমজাদ হোসেন বলেন, এসপিইসি সভার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংশোধনী প্রস্তুত করতে সময় লেগেছে। দাপ্তরিক নথিপত্র সংশোধন করে টিএপিপি পুনর্গঠন করেও পাঠানো হয়েছে।

তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কিছু কার্যক্রম ইতোমধ্যে চলছে। প্রকল্পের মাধ্যমে একটি ডিজিটাল সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ শ্রমিকের তথ্য ডাটাবেজে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া ৯২টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড-বায়ার এই স্কিমে অর্থায়ন করছে এবং বেকার হয়ে পড়া শ্রমিকদের তিন মাসের জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা সহায়তার একটি প্রটোকল তৈরি করা হয়েছে।

আমজাদ হোসেন আশা প্রকাশ করেন, একনেকে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাবে।

ব্যয়ের বড় অংশ পরামর্শক ও সভা-সেমিনারে

প্রকল্পের ব্যয়ের খাতভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি বড় অংশ রাখা হয়েছে পরামর্শক ফি, সফটওয়্যার ক্রয়, বিদেশ সফর এবং সভা-সেমিনারের জন্য।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দুর্ঘটনাজনিত বীমা (ইআইএস) এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রকল্পের অর্থের বড় অংশ পরামর্শক ও সভা-সেমিনারে ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক।

অনুমোদনের আগে কাজ নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিতে এটিকে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ২০২৬-এর ‘শ্রম ও শ্রমিক কল্যাণ’ অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) ৮ দশমিক ৮-এর নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে একনেক অনুমোদনের আগেই প্রকল্পের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে যাওয়া, অনুদান চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং টিএপিপি পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সুপারিশে জিআইজেডের সহায়তায় ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ বলেন, একনেকের অনুমোদনের আগে প্রকল্পের কাজ শুরু করার নিয়ম নেই। অনুদানভিত্তিক প্রকল্প হলেও অনুমোদন ছাড়া কাজ শুরু করার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, অনুমোদনের আগে কাজ শুরু করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

তিনি আরও বলেন, কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে কারিগরি প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাস্তবে কাজ হয়েছে কি না, নাকি কাগজে-কলমে কাজ দেখানো হয়েছে—তা নিশ্চিত হওয়ার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।