আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : বৃহস্পতিবার ১লা অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার যমুনা নদীর চরাঞ্চলে সুজুনি খালের ওপর একটি সেতুর অভাবে প্রায় ছয় দশক ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দুই জেলার চারটি ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। বর্ষায় খেয়া নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে ভাঙাচোরা ও অনুপযোগী সড়ক—দুই মৌসুমেই এখানকার মানুষের চলাচলে ভোগান্তির যেন শেষ নেই।
সুজুনি খালটির অবস্থান কাজিপুর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের পশ্চিম কুমারিয়াবাড়ি গ্রামে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কাজিপুরের মনসুরনগর ও চরগিরিশ এবং জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার পোগলদিঘা ও সাতপোয়া ইউনিয়নের মানুষের জন্য খালটি পারাপার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, হাটবাজার ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে যেতে অনেককেই এই খাল পার হতে হয়।
কিন্তু দীর্ঘ সময়েও খালের ওপর স্থায়ী সেতু নির্মিত না হওয়ায় প্রতিদিনই বিপাকে পড়তে হচ্ছে স্থানীয়দের।
বর্ষা মৌসুমে খাল পারাপারের প্রধান ভরসা খেয়া নৌকা। স্থানীয়রা জানান, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নৌকা চলাচল করলেও বিকেল গড়ানোর পর পারাপার বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সন্ধ্যার পর কেউ অসুস্থ হলে বা জরুরি প্রয়োজনে কোথাও যেতে হলে তৈরি হয় বাড়তি দুর্ভোগ। বিশেষ করে রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে খালের পানি কমে গেলেও সমস্যার সমাধান হয় না। পানি শুকিয়ে গেলে খালের তলদেশ দিয়ে চলাচলের উপযোগী সড়ক না থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহন ও যানবাহন চলাচলে ভোগান্তি বাড়ে। ফলে বছরের একটি সময় নৌকার সংকট, আরেক সময় সড়ক যোগাযোগের সমস্যায় আটকে থাকেন দুই তীরের মানুষ।
কুমারিয়াবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মানিক মিয়া বলেন, “বর্ষায় খালে পারাপারে সেতু দরকার, আবার শুষ্ক মৌসুমে দুপাশের সংযোগ সড়কের সংস্কার দরকার। পানি থাকুক আর না থাকুক, আমাদের কষ্ট সারা বছরই এক।”
শুধু সাধারণ মানুষের যাতায়াত নয়, শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত এই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। খালের পূর্ব তীরে একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি ডিগ্রি কলেজ রয়েছে। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীকে খেয়া নৌকায় খাল পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়।
চরগিরিশের এম মনসুর আলী জাতীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমা বেগম বলেন, “বন্যার সময় শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে। পর্যাপ্ত নৌকা না থাকায় সময়মতো ক্লাসে আসতে পারে না তারা।”
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিয়া খাতুনও জানায়, নৌকা ধরতে না পারলে অনেক সময় তাদের ক্লাস মিস হয়। বর্ষার দিনে খাল পারাপারের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে শিক্ষার্থীরাও একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, সেতুর অভাবে কৃষিপণ্য পরিবহনেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মনসুরনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রেজাউল করিম দুলাল এবং সাবেক সদস্য হাবিবুর রহমান জানান, খালের দুই তীরের কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেতু নির্মাণ করা হলে কৃষিপণ্য সহজে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খালের ওপর সেতু নির্মাণের দাবি থাকলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহনসহ দৈনন্দিন নানা কাজে তাদের অতিরিক্ত সময় ও ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে সরিষাবাড়ী উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া তমাল বলেন, সুজুনি খালের অবস্থান কাজিপুর উপজেলার সীমানায় পড়ায় সরিষাবাড়ী উপজেলার মাধ্যমে সেখানে সেতু নির্মাণের আইনগত সুযোগ নেই।
তবে কাজিপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. মুনসুর আহমেদ জানান, সুজুনি খালের ওপর সেতু নির্মাণের জন্য একটি সম্ভাব্যতা পরিকল্পনা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন পেলে দীর্ঘদিনের এই যোগাযোগ সংকটের অবসান হবে। একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে যমুনার চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও দৈনন্দিন যাতায়াত আরও সহজ হবে।