আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অপব্যবহার করে মানুষের সম্মানহানি এবং মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঠেকাতে সরকার পদক্ষেপ নিতে চায় বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এআই ব্যবহার করে অনেক সময় এমনভাবে কোনো ব্যক্তিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার সঙ্গে বাস্তবে ওই কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও কিংবা অন্যান্য কনটেন্টের মাধ্যমে একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই এআইয়ের অপব্যবহার এবং অপতথ্য ঠেকাতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চায়।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। প্রধানমন্ত্রীও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চান না এবং সরকারও তা করবে না। বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে একই সঙ্গে মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন, অসত্য তথ্য ও গুজব নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। এসব বিষয়ে সাংবাদিক নেতা, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এআই প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে ভুয়া ছবি, ভিডিও বা বক্তব্য তৈরি করাও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। ফলে কোনো তথ্য সত্য কি না যাচাই করার আগেই তা ছড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক ও পেশাগত জীবনে তার প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি কনটেন্টের সত্যতা যাচাই এবং মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে সাংবাদিকদের সাইবার আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও উঠে আসে। নিবন্ধিত প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে সাইবার আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানান ইয়াসের খান চৌধুরী।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের অবাধে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করতে এ ধরনের সুরক্ষা থাকা উচিত। তবে একই সঙ্গে মূলধারার গণমাধ্যমের বাইরে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অপপ্রচার, ভুয়া প্রচার ও অসত্য তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, অনেকেই মূলধারার কোনো গণমাধ্যমে কাজ না করেও সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পেজ খুলে সাংবাদিক পরিচয়ে তথ্য প্রকাশ করছেন, আবার সেই পেজ বন্ধ করে অন্য নামে নতুন পেজ খুলছেন। এভাবে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
কারা সাংবাদিক হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারণে কী ধরনের মানদণ্ড থাকা উচিত—এ বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
এদিকে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে সরকার আরও বৃহত্তর পরিসরে নীতিগত ও আইনগত কাঠামো তৈরির বিষয়েও কাজ করছে। এআইয়ের ব্যবহার ও অপব্যবহারকে ঘিরে আইন প্রণয়নের বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। প্রযুক্তির সুফল নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তির অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কীভাবে তা মোকাবিলা করা হবে, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে এ ধরনের আইন বা নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ডিআরইউর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে সংগঠনটির বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়েও আলোচনা করেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী। সাংবাদিকদের পেশাগত পরিবেশ উন্নয়ন, গণমাধ্যমের বিভিন্ন সমস্যা এবং সাংবাদিকদের দাবি কীভাবে পূরণ করা যায়, সে বিষয়ে তাদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এআই প্রযুক্তি আরও বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সুফল যেমন বাড়ছে, তেমনি অপব্যবহারের ঝুঁকিও সামনে আসছে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির ছবি, কণ্ঠ বা পরিচয় ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য তৈরি ও প্রচারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির অপব্যবহার বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই এআইয়ের ব্যবহারকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পর্যায়ে রাখতে আইন, নীতিমালা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা এবং সাধারণ মানুষের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা—সবগুলো বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে এআইয়ের অপব্যবহার করে ব্যক্তির সম্মানহানি এবং অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি এখন নীতিনির্ধারণী আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ভর করবে চলমান আলোচনা, সংশ্লিষ্টদের মতামত এবং ভবিষ্যতে নেওয়া আইনগত সিদ্ধান্তের ওপর।