জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের জন্য ২ হাজার ৩৬৪ ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ

জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের জন্য ২ হাজার ৩৬৪ ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ

সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের আবাসন নিশ্চিত করতে ২ হাজার ৩৬৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে শহীদ পরিবারের জন্য ৮০৪টি এবং কর্মক্ষমতা হারানো জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারের জন্য ১ হাজার ৫৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের গত ছয় মাসের কার্যক্রম এবং নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতিও উপস্থাপন করা হয়।

বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় ৩৮৭ কোটি টাকা

বৈঠকে জানানো হয়, গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ১৫৪ জন জুলাই যোদ্ধার বিদেশে চিকিৎসায় ৩৮৭ কোটি ২২ লাখ ১১ হাজার ৯৩৩ টাকা ব্যয় হয়েছে।

বিদেশে চিকিৎসা, শহীদ পরিবারের সঞ্চয়পত্র, জুলাই যোদ্ধাদের এককালীন অনুদান এবং শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা মিলিয়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ১ হাজার ৪৫ কোটি ৮২ লাখ ২০ হাজার ৩১২ টাকা বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এ ছাড়া জুলাই শহীদ পরিবার এবং স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতাহীন গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ২৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

শহীদ পরিবারকে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন আইন, ২০২৬’-এর আওতায় শহীদ পরিবারকে এককালীন ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এই সহায়তার কাঠামো আগের সরকারি ঘোষণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮৪২ জন শহীদের নাম গেজেটভুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৮১৩ জনের উত্তরাধিকারীদের সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতা দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৯টি পরিবারের ক্ষেত্রে ওয়ারিশসংক্রান্ত জটিলতা ও অভিযোগ থাকায় তদন্ত চলছে।

অন্যদিকে গেজেটভুক্ত ১৪ হাজার ৩৬৮ জন জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ১৩ হাজার ৫৩৬ জনকে মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ‘ক’ শ্রেণির যোদ্ধারা মাসে ২০ হাজার, ‘খ’ শ্রেণির ১৫ হাজার এবং ‘গ’ শ্রেণির যোদ্ধারা ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। এ ধরনের শ্রেণিভিত্তিক ভাতার কাঠামো সরকারি তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে।

নতুন করে জুলাই যোদ্ধা তালিকাভুক্তির সুযোগ

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জুলাই যোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির বিষয়েও আলোচনা হয়। কমিটির সদস্যরা বলেন, আহত বা নিহত না হওয়ায় কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের অভাবে অনেক প্রকৃত অংশগ্রহণকারী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও কমিটির সদস্য আহমেদ আযম খান বলেন, তালিকাভুক্তির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দেশব্যাপী অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পুনরায় আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও তালিকাভুক্তির কার্যক্রম উন্মুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের শনাক্ত করতে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হবে। একই সঙ্গে অযোগ্য কেউ যাতে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে না পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

জুলাই শহীদদের নামে ৭৮ সরকারি স্থাপনা

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণের উদ্যোগের কথাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার পর ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ৭৮টি সরকারি স্থাপনার নাম জুলাই শহীদদের নামে করার তথ্য পাওয়া গেছে।

অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আরও ৩ হাজার বীরনিবাস

মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ২ হাজার ১০২টি বীরনিবাস নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এ ছাড়া আরও ৩ হাজার বীরনিবাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ’ নামে প্রকল্পটি এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য যাচাই ও ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজও চলছে। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ৮৭ হাজার ৭৫৪ জনের লাইভ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি ৪৮ হাজার ২৪৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার ২ লাখ ১০ হাজার ৬৪১ জন ওয়ারিশের তথ্য ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের ৪ হাজার ২৩৪ মামলা

বৈঠকে জানানো হয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট মোট ৪ হাজার ২৩৪টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩৩টি রিট, ৩৬টি আপিল, ১৪টি রিভিউ, ৮৩টি কনটেম্পট এবং ১৫৫টি দেওয়ানি মামলা রয়েছে।

এসব মামলা সরকারের স্বার্থের অনুকূলে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।