আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : বুধবার ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মী সংকট এবং দীর্ঘ ক্লাস সূচির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে নেমেছে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত সপ্তাহে প্যারিস থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে চার শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশটির প্রায় ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৪০০টি স্কুল বিক্ষোভ বা বিক্ষোভজনিত বিশৃঙ্খলার প্রভাবে পড়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করা হয়। আন্দোলনকারীদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কম চাপের ক্লাস সূচি নিশ্চিত করা।
উত্তরাঞ্চলীয় শহর লিলে পরিস্থিতি একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে শিক্ষার্থীরা ময়লার ঝুড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের দিকে বোতল, পাথরসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়ে। কয়েকটি বাসস্টপ ও বিজ্ঞাপনের বোর্ড ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। একই ধরনের উত্তেজনা দেখা গেছে বোর্দো, রেন, নঁত, মার্সেই ও লিয়ঁসহ বিভিন্ন শহরেও।
প্যারিসের লামার্তিন উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের হাতে দেখা যায় দীর্ঘ ক্লাস সূচির বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা—ঘুমের চেয়েও বেশি সময় ক্লাস।’ শিক্ষার্থীদের ইউনিয়নের নেতারা বলছেন, অনেক শ্রেণিকক্ষে ৩২ থেকে ৩৫ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকছে। শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীর ঘাটতির কারণে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বিক্ষোভের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে মুখ ঢেকে বিভিন্ন বস্তু নিয়ে এসে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকারের হিসাবে, সংঘর্ষে কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বিক্ষোভ দমনে পুলিশ অতিরিক্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
প্যারিসের উপকণ্ঠ সেইন-সাঁ-দনি এলাকায় কয়েকশ শিক্ষার্থীর একটি বিক্ষোভে স্থানীয় মেয়র বালি বাগায়োকোও অংশ নেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলান এবং তাদের দাবিকে বৈধ বলে মন্তব্য করেন। পরে সেখানে ভিড় বাড়লে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উত্তেজনা তৈরি হয়। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনাও ঘটে বলে এএফপি জানিয়েছে।
বিক্ষোভের পাশাপাশি ফ্রান্সজুড়ে সরকারি খাতের কর্মীরাও ধর্মঘটে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট পরিকল্পনা ঘিরে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এ কর্মসূচি পালন করছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ রয়েছে। মঙ্গলবার বিভিন্ন সরকারি খাতের কর্মীরা কাজে যোগ দেননি এবং শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।
শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন ইউনিয়ন সিন্দিকাল লিসেন (ইউএসএল) দেশজুড়ে উচ্চবিদ্যালয় অবরোধের ডাক দিয়েছিল। সংগঠনটির সভাপতি রিয়াদ রানি অবশ্য আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা সামগ্রিকভাবে শিক্ষা খাতে সম্পদের ঘাটতি, অতিরিক্ত ভিড়ের শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষক-কর্মী সংকটের প্রতিবাদ করছে।
রানি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বয়স মূলত ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। তাদের দাবির জবাবে পুলিশ ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি। তার দাবি, কিছু শিক্ষক ও স্কুলকর্মী পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি সংঘর্ষ ঠেকাতে শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়েছেন।
শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যেও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন দেখা গেছে। ফ্রান্সের প্রধান শিক্ষক সংগঠনগুলোর একটি এফএসইউর মহাসচিব ক্যারোলিন শেভে বলেছেন, শিক্ষার্থীরা যে সমস্যাগুলোর কথা বলছে, শিক্ষক ও স্কুলকর্মীরাও একই সমস্যার মুখোমুখি। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপ শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে বিক্ষোভকে ঘিরে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু স্কুলের সামনে আগুন, আতশবাজি ও সহিংসতার নিন্দা করে বলেছেন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মী কিংবা পুলিশ—কাউকেই বিপদের মধ্যে ফেলার মতো কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবুয়াঁর নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলেছেন। লেকর্নু পাল্টা মেলঁশোঁর বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন উত্তেজনা সৃষ্টি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
শিক্ষার্থী বিক্ষোভ এবং সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট—দুই কর্মসূচি একই সময়ে চলায় ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে জনজীবন ও শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। তবে আন্দোলনের মূল কেন্দ্র এখনো শিক্ষা খাতের সংকট—শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মীর ঘাটতি এবং দীর্ঘ ক্লাস সূচি। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার পথ কতটা তৈরি হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।