আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : বৃহস্পতিবার ১লা অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
ক্যাপশন নেই
‘শোনো গো দখিনো হাওয়া’, ‘তুমি এসেছিলে পরশু’, ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে’—দুই বাংলার সংগীতপ্রেমীদের কাছে আজও সমান জনপ্রিয় এসব কালজয়ী গান। বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতভুবনে অনন্য এক অধ্যায়ের নাম শচীন দেব বর্মণ। আজ ১ অক্টোবর, কিংবদন্তি এই সুরকার, গায়ক ও সংগীত পরিচালকের জন্মদিন।
১৯০৬ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেব বর্মণ। সংগীতাঙ্গনে তিনি ‘এস ডি বর্মণ’ নামে পরিচিত হলেও শ্রোতাদের কাছে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার নাম হয়ে উঠেছিল ‘শচীন কর্তা’।
ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত এক সংগীতময় পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণ ছিলেন সেতারবাদক ও ধ্রুপদি সংগীতশিল্পী। ফলে শৈশব থেকেই সংগীতের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে গায়ক হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন তিনি।
ধ্রুপদি সংগীতের পাশাপাশি বাংলার লোকসংগীতের প্রতিও ছিল তার গভীর অনুরাগ। নদী, মাঠ, মাটি ও মানুষের জীবন থেকে উঠে আসা সুরকে নিজের সংগীতভাবনার সঙ্গে মিশিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র এক সংগীতভাষা। ১৯৩৪ সালে সর্বভারতীয় সংগীত সম্মেলনে গান গেয়ে তিনি সংগীতজগতের বিশিষ্টজনদের প্রশংসা অর্জন করেন। তার কণ্ঠে এবং নতুন সংগীতরূপে ‘নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে’ গানটিও জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৯৪০-এর দশকে শচীন দেব বর্মণ মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। সেখানেই চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনায় তার দীর্ঘ ও সফল অধ্যায়ের সূচনা। একের পর এক চলচ্চিত্রে সুরারোপ করে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। ‘মাটির ঘর’, ‘তেরে ঘর কে সামনে’, ‘মিস ইন্ডিয়া’, ‘প্রেম পূজারী’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তার সুর দর্শক-শ্রোতার মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
তার সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন উপমহাদেশের সংগীতের বহু কিংবদন্তি শিল্পী। লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, আশা ভোঁসলে, মান্না দে, গীতা দত্ত ও তালাত মাহমুদের মতো শিল্পীদের কণ্ঠে শচীন দেব বর্মণের সৃষ্ট গান পেয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। বাংলা লোকসুর, ধ্রুপদি সংগীত ও আধুনিক চলচ্চিত্র সংগীতের সমন্বয়ে তিনি যে স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের বহু সংগীতশিল্পীকে প্রভাবিত করেছে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শচীন দেব বর্মণ পেয়েছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মশ্রী, সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার সেরা সংগীত পরিচালকের সম্মান।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য গান ও সুর রেখে ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন শচীন দেব বর্মণ। কিন্তু তার সৃষ্ট সুর থেমে যায়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে আজও তার গান ফিরে আসে মানুষের কণ্ঠে, স্মৃতিতে ও ভালোবাসায়।
কুমিল্লার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী তাই শুধু একটি সময়ের সংগীত ব্যক্তিত্ব নন; বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা এক চিরস্মরণীয় নাম। জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হচ্ছে কালজয়ী এই সুরস্রষ্টাকে।