আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : বুধবার ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
বাংলাদেশের ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সিদ্ধান্তটি আসলে কে নিয়েছিলেন—তার স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। বিভিন্ন ক্রিকেটার, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ভূমিকার কথা উঠে এলেও, ঘটনার অন্যতম প্রধান দুই সিদ্ধান্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আসিফ নজরুল ও তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সরাসরি বক্তব্য ছাড়াই প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে।
ড. এ. কে. এম. ওয়ালী উল্লাহ, সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন ও ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীরকে নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি বিভিন্ন ক্রিকেটার, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও বিশ্লেষকের বক্তব্য, টেলিভিশন ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরি করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে করা ওই দাবি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) প্রত্যাখ্যান করার পর বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি। পরে ২৪ জানুয়ারি আইসিসি জানায়, প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী খেলতে বিসিবির অস্বীকৃতির পর বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একাধিক সাক্ষ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলই বিশ্বকাপে না খেলার মূল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ক্রিকেটারদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকটিও মূলত সেই সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য ছিল বলে বিভিন্ন সাক্ষ্যে উঠে এসেছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব উল আলমের বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, সংবাদ সম্মেলন ডাকার পর ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজেই তাকে সিদ্ধান্তের কথা জানান। ক্রিকেটারদের বিষয়টি জানানোর আগে বিসিবির সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান সচিব।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল চাপের কারণে ক্রীড়া উপদেষ্টার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারছিলেন না। অন্যদিকে বিসিবির সহসভাপতি ও সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলা উচিত বলে মত দেন।
তদন্ত কমিটি বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল, টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস, টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, সাবেক পরিচালক নাজমুল আবেদীনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেয়।
ক্রীড়া সাংবাদিকদের দুটি সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গেও কথা বলে কমিটি। এসব বক্তব্যে বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একক ভূমিকার কথা উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সে সময় আসিফ নজরুল দাবি করেছিলেন, বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত বিসিবি, ক্রিকেটার ও সরকারের যৌথ সিদ্ধান্ত।
তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে নাজমুল হোসেন শান্ত বলেন, আসিফ নজরুলই ছিলেন একমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। তবে সিদ্ধান্তটি সমর্থন করার পক্ষে কারা ছিলেন, তা তিনি নিশ্চিত নন। শান্ত আরও জানান, সে সময় জাতীয় দলের প্রস্তুতি ও মানসিক অবস্থা ভালো ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, কমিটি আসিফ নজরুল ও আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের সাক্ষাৎ পায়নি। ফলে বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে যাদের ভূমিকার কথা এসেছে, তাদের দুজনের বক্তব্য ছাড়াই তদন্ত শেষ করতে হয়েছে কমিটিকে।
এ কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রশ্নের অবকাশ থেকে গেছে।
সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বেও তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাওয়া হয়, বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তের উৎস কোথায় ছিল। জবাবে তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বিসিবি তা পালন করেছে।
তবে এই বক্তব্য তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় নিয়েছে এবং বিসিবি তা পালন করেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিকেটকে রাজনৈতিক বিরোধ থেকে দূরে রাখা, বিসিবির স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট করা, সংকটকালীন যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং স্বাধীনভাবে নিরাপত্তা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।
কমিটির মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।