আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : সোমবার ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়ম, লোডশেডিং ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা জনজীবন ও অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি করছে, তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া মোকাবিলা করা কঠিন। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে কার্যকর ও টেকসই সমাধানের অন্যতম পথ। দেশের বড় একটি সময়জুড়ে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। অথচ সরকারি-বেসরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে স্টেশন, শিল্পকারখানা ও আবাসিক ভবনের অসংখ্য ছাদ এখনো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়নি। সরকার চাইলে একটি সময়বদ্ধ জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।
প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের সরকারি অফিস-আদালত ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোতে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এরপর ছয় মাসের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বাণিজ্যিক ভবনগুলোকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে শুধু সৌর প্যানেল স্থাপন করলেই হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, গ্রিড-সংযুক্ত (অন-গ্রিড) সৌরবিদ্যুৎ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এতে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ ব্যয়ও কমানো সম্ভব হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এই সাশ্রয়ী অর্থ আবার বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
শুধু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ জনগণকেও এই উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার করতে হবে। সরকার স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য সহজ শর্তে, প্রয়োজনে সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদের অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারে।
এই অর্থ দিয়ে বাড়ির ছাদ, টিনের চাল বা উপযুক্ত স্থানে সৌর প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে। পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে সেই অর্থ পরিশোধের সুযোগ পেতে পারে। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ভর্তুকি এবং তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের জন্য ঋণভিত্তিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এভাবে ‘সবার জন্য সৌরবিদ্যুৎ’ ধরনের একটি জাতীয় কর্মসূচি নেওয়া গেলে একদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ জনগণের নিজেদের বাড়িতেই বিকেন্দ্রীভূতভাবে উৎপাদিত হবে।
দেশের রেলওয়ে স্টেশন ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের শেড, বিভিন্ন ভবন, কার্যালয় ও ওয়ার্কশপে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিটি স্টেশনের ছাদ ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থাপনা পরিদর্শন করে কতটুকু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, তার একটি হিসাব তৈরি করতে পারে। একইভাবে লঞ্চ টার্মিনালগুলোর শেড ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থাপনাও কাজে লাগানো যেতে পারে।
এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ পূরণ হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে।
দেশের হাজার হাজার সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের ছাদ পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
একটি বিদ্যালয় হয়তো অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে সম্মিলিতভাবে এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বাস্তব শিক্ষারও সুযোগ তৈরি করবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে তারা হাতে-কলমে ধারণা লাভ করতে পারবে।
দেশের অসংখ্য মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভবনেও সৌর প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বড় মসজিদ, মডেল মসজিদ ও অন্যান্য বড় ধর্মীয় স্থাপনার ছাদ কাজে লাগানো যেতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ চাহিদা অনুযায়ী ছোট ও মাঝারি আকারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিদ্যুতের একটি অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবে।
তবে এসব প্রকল্পে অর্থায়ন, মালিকানা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদিত বিদ্যুতের হিসাব স্বচ্ছ রাখতে হবে।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুৎ সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। এটি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উৎস হতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় বেশি উৎপাদিত হয়, কিন্তু সন্ধ্যা ও রাতে এর উৎপাদন কমে যায়। তাই সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নিম্নমানের সৌর প্যানেল বা অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া নাও যেতে পারে। তাই সরকারকে মান নির্ধারণ, অনুমোদিত সরবরাহকারী নির্বাচন, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি প্রকল্প নয়; বরং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি। সরকার চাইলে ‘জাতীয় রুফটপ সোলার মিশন’ বা এ ধরনের একটি কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে।
এর আওতায় সরকারি অফিস-আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা, রেলওয়ে স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ-মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আবাসিক ভবন এবং সাধারণ মানুষের বাড়ির ছাদকে ধাপে ধাপে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা যেতে পারে।
প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য ছাদ ও স্থাপনার একটি ডিজিটাল তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। কোথায় কত কিলোওয়াট বা মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, কত ব্যয় হবে এবং কত বছরে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসতে পারে—তার বাস্তবসম্মত হিসাবও করা প্রয়োজন।
এ ধরনের বিশাল কর্মসূচি শুধু সরকারের পক্ষে একা বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাই স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির কমিটি, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সরকার অর্থায়নের পাশাপাশি নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দিতে পারে। ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি সহজ কিস্তির ঋণ দিতে পারে। বেসরকারি খাত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে পারে। আর জনগণ হতে পারে বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশীদার।
বিদ্যুৎ সংকট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি জড়িত।
তাই সংকট দেখা দিলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির পাশাপাশি বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের প্রতিটি উপযুক্ত ছাদ যদি একটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত হয়, প্রতিটি রেলওয়ে স্টেশনের শেড যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং প্রতিটি বড় স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের বিদ্যুতের একটি অংশ নিজেরাই উৎপাদন করে, তাহলে সম্মিলিতভাবে এর প্রভাব ছোট হবে না।
প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং কঠোর বাস্তবায়ন। আজ যে ছাদগুলো খালি পড়ে আছে, আগামী দিনের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সেই ছাদগুলোই হতে পারে আমাদের অন্যতম বড় সম্পদ। বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে।