আনন্দবাংলা
আনন্দবাংলা
আপডেট : রবিবার ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ১১:০৮ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
দুঃসময়ের মানুষকে সুসময়ে মনে রাখুন
রাজনীতিতে কিছু মানুষ আছেন, যাদের পরিচয় পদ-পদবি দিয়ে শেষ করা যায় না। তাদের প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় সময়ের পরীক্ষায়—দুঃসময়ে তারা কোথায় ছিলেন, কতটা ঝুঁকি নিয়েছেন, কতটা সহ্য করেছেন এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও কতটা অবিচল থেকেছেন, তার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় এমন অসংখ্য নেতা-কর্মী রয়েছেন, যারা আলোচনার কেন্দ্রে নেই, গণমাধ্যমের শিরোনামে নেই, ক্ষমতার করিডোরে নিয়মিত যাতায়াতও নেই। অথচ দলের দুঃসময়ে তারাই ছিলেন রাজপথে। মামলা, হামলা, হয়রানি, নির্যাতন কিংবা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা—কোনো কিছুই তাদের পথ থেকে সরাতে পারেনি। তারা অনেক সময় অভিমান করেছেন, কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু অভিযোগের বাজারে নিজেদের বিক্রি করেননি। নীরবে দলের জন্য কাজ করে গেছেন।
জয়ন্ত কুমার কুন্ডু তেমনই একজন রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলীয় কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং প্রতিকূল সময়ের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন।
তবে এই লেখার কারণ শুধু তার রাজনৈতিক পরিচয় নয়।
ব্যক্তিগতভাবে জয়ন্ত কুমার কুন্ডুর সঙ্গে আমার আগে কোনো পরিচয় ছিল না। একদিন হঠাৎ সিলেট যাওয়ার পথে একটি রেস্টুরেন্টে আমাদের দেখা। বাস সেখানে কিছু সময়ের জন্য থেমেছিল। কথায় কথায় পরিচয় হলো। আমার বাড়ি শৈলকুপা—এই পরিচয় জানার পর তার আন্তরিকতা, সৌজন্যবোধ এবং সহযোগিতার মানসিকতা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছিল।
কখনো কখনো মানুষের চরিত্র বোঝার জন্য দীর্ঘদিনের পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। অল্প সময়ের কথোপকথনেও একজন মানুষের ভেতরের সৌজন্য, বিনয় ও মানবিকতা প্রকাশ পায়।
জয়ন্তের সঙ্গে সেই স্বল্প সময়ের সাক্ষাৎ আমার মনে এমনই একটি দাগ রেখে গেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমন মানুষদের আমরা কতটা মূল্যায়ন করছি?
ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়। সুসময়ে অনেক নতুন মুখ সামনে চলে আসে। তারা দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠে, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পায়, বিভিন্ন কমিটি ও প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নেয়। তাদের অনেকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সীমিত, দুঃসময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ইতিহাসও নেই।
অন্যদিকে যারা বছরের পর বছর দলকে সময় দিয়েছেন, প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেছেন, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন—তাদের অনেকেই অপেক্ষার সারিতে থেকে যান।
এখানেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
দুঃসময়ের ত্যাগী মানুষকে সুসময়ে মূল্যায়ন করতে হয়।
কারণ ক্ষমতার সময় পাশে থাকা আর বিপদের সময় পাশে থাকার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
সুসময়ের মানুষ অনেক সময় পরিস্থিতির সঙ্গে আসে। পরিস্থিতি বদলালে তারা নিজেদের অবস্থানও বদলে নেয়। কিন্তু যারা দুঃসময়ে পাশে থাকে, তারা কেবল কোনো ব্যক্তির সঙ্গে থাকে না—তারা একটি আদর্শ, একটি রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং একটি সংগঠনের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে যুক্ত করে।
সরকার যখন সংকটে পড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় পরীক্ষিত মানুষের। প্রয়োজন হয় এমন মানুষ, যারা চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, মাঠের বাস্তবতা বোঝে, মানুষের ভাষা বুঝতে পারে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পালিয়ে না গিয়ে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়।
রাজনীতির ভাষায় যাদের অনেক সময় ‘অতিথি পাখি’ বলা হয়, তারা ক্ষমতার আকাশে যতই সুন্দরভাবে উড়ুক, ঝড় এলে তাদের অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যেতে পারে।
কিন্তু দুঃসময়ের মানুষ?
তারা সাধারণত ঝড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকে।
কারণ তারা জানে—এই পথ তাদের কাছে নতুন নয়।
তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু আনুগত্য নয়, প্রয়োজন যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং পরীক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়।
জয়ন্ত কুমার কুন্ডুর মতো নেতাদের মূল্যায়নের প্রশ্নটি তাই কোনো ব্যক্তিকে একটি পদ দেওয়ার প্রশ্নমাত্র নয়। এটি আসলে একটি রাজনৈতিক দর্শনের প্রশ্ন—আমরা কাদের সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চাই?
অবশ্যই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাউকে শুধু রাজনৈতিক ত্যাগের কারণে বসানো উচিত নয়। সেখানে যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা ও সংশ্লিষ্ট কাজের উপযুক্ততা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতাকেও অবহেলা করা উচিত নয়।
একজন দীর্ঘদিনের মাঠকর্মী জানেন মানুষের ক্ষোভ কোথায়। তিনি জানেন সংগঠনের দুর্বলতা কোথায়। তিনি জানেন কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে। তিনি জানেন সংকটের সময় কর্মীদের কীভাবে সংগঠিত করতে হয়। এই অভিজ্ঞতা কোনো বই পড়ে একদিনে অর্জন করা যায় না।
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যেই এমন অসংখ্য নেতা রয়েছেন—যারা আজও নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা পদ না পেয়ে দল ছাড়েননি। মন্ত্রিত্ব না পেয়ে রাজনীতি থেকে সরে যাননি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব না পেলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানো বন্ধ করেননি।
তাদের কেউ হয়তো অভিমান করেছেন।
কেউ হয়তো মনে মনে প্রশ্ন করেছেন—‘আমাদের এতদিনের ত্যাগের মূল্য কোথায়?’
কিন্তু তারা প্রকাশ্যে অভিযোগের পাহাড় তৈরি করেননি।
এমন মানুষদের হারিয়ে ফেলা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য যেমন ক্ষতি, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতি।
কারণ রাজনীতিতে নতুন প্রজন্ম প্রয়োজন—এটি সত্য। নতুন মেধা প্রয়োজন—এটিও সত্য। কিন্তু নতুনদের জায়গা করে দিতে গিয়ে পুরোনো পরীক্ষিত মানুষদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না।
বরং প্রয়োজন একটি ভারসাম্য।
নতুন মেধা আসবে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে, তরুণরা দায়িত্ব পাবে—আর অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতারা তাদের পথ দেখাবেন।
এই সমন্বয়ই পারে একটি রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে।
জয়ন্ত কুমার কুন্ডুর সঙ্গে আমার সেই আকস্মিক সাক্ষাৎ হয়তো খুব ছোট একটি ঘটনা। কিন্তু সেই ছোট্ট ঘটনাই আমাকে একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—আমরা কি সত্যিই মানুষের রাজনৈতিক ত্যাগের মূল্য বুঝতে শিখেছি?
আমার বিশ্বাস, ক্ষমতায় থাকার সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। কে আজ পাশে আছে—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত, কে বিপদের দিনে পাশে ছিল?
কে আজ পরিচিত—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কে দীর্ঘদিন মানুষের পাশে থেকে নিজেকে প্রমাণ করেছে?
আর কে পদ চাইছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কে দায়িত্ব পাওয়ার যোগ্য?
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে অবশ্যই দক্ষ, মেধাবী ও যোগ্য মানুষকে দায়িত্ব দিতে হবে। কিন্তু সেই যোগ্যতার তালিকায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকেও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ একটি সরকারের শক্তি শুধু তার ক্ষমতায় নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে তার চারপাশে থাকা মানুষগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতায়।
যারা দুঃসময়ে পাশে ছিল, তাদের মূল্যায়ন করলে তারা সুসময়ে শুধু পাশে থাকবে না—সংকটের মুহূর্তেও সামনে দাঁড়াবে।
আর যারা শুধু সুসময়ের অতিথি, তাদের ওপর পুরো ভবিষ্যৎ নির্ভর করা কখনোই নিরাপদ নয়।
তাই জয়ন্ত কুমার কুন্ডু একা নন। তার মতো আরও অসংখ্য ত্যাগী, মেধাবী ও পরীক্ষিত নেতা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছেন। তারা হয়তো প্রচারের আলোয় নেই। তারা হয়তো নিজেদের জন্য দরজা খুলতে ব্যস্ত নন। কিন্তু তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
তাদের খুঁজে বের করা, তাদের যোগ্যতা যাচাই করা এবং উপযুক্ত জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া—এটি শুধু দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ।
রাজনীতিতে পদ মানুষকে বড় করে না।
মানুষের ত্যাগ, যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধই শেষ পর্যন্ত পদকে বড় করে।
সুসময়ে যারা চারপাশে ভিড় করে, তাদের সংখ্যা হয়তো অনেক।
কিন্তু ঝড়ের রাতে যারা ছাতা না হয়ে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়—তাদের সংখ্যা সবসময়ই কম।
আর রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন সময়ে, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষগুলোরই প্রয়োজন হয়।
তাই সময় থাকতে দুঃসময়ের মানুষগুলোকে চিনুন।
তাদের অভিমান জমতে দেবেন না।
তাদের অবহেলায় হারিয়ে ফেলবেন না।
কারণ সংকটের দিনে নতুন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না—পরীক্ষিত মানুষকে তখনই মনে পড়ে, যখন তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
জাহিদ শাওন
সাংবাদিক ও লেখক