আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : বৃহস্পতিবার ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
ক্যাপশন নেই
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তার এবং কর্মক্ষেত্রে অটোমেশনের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে চাকরির ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ভালো ফলাফল নয়, বাস্তবে কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়—এমন দক্ষতার গুরুত্বও বাড়ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, ডেটা, এআই, বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ এবং দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ বলছে, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রায় ৩৯ শতাংশ দক্ষতায় পরিবর্তন আসতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে এ সময় সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতার মধ্যে রয়েছে এআই ও বিগ ডেটা, নেটওয়ার্ক ও সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান। একই সঙ্গে সৃজনশীল চিন্তা, স্থিতিস্থাপকতা, নমনীয়তা ও দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং আজীবন শেখার মানসিকতার গুরুত্বও বাড়বে।
এদিকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত কেয়ারমাইন্ডসের একটি গবেষণায় ৯ হাজার ৭০০টি জীবনবৃত্তান্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, কোন ধরনের দক্ষতা সিভিতে থাকলে চাকরি পাওয়ার সঙ্গে বেশি সম্পর্ক দেখা যায়। গবেষণাটিতে প্রযুক্তিগত ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সফটওয়্যার ও টুল ব্যবহারের সক্ষমতার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
চাকরির বাজারে শিক্ষাগত যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই এখন একমাত্র বিবেচ্য নয়। একজন প্রার্থী বাস্তবে কী করতে পারেন, কোন সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন এবং কোনো সমস্যার সমাধানে তাঁর দক্ষতা কতটা—এসব বিষয় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
কেয়ারমাইন্ডসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব জীবনবৃত্তান্তে অন্তত একটি প্রযুক্তিগত বা বিশ্লেষণী দক্ষতা ছিল, সেসব প্রার্থীর ২০ দশমিক ১ শতাংশ নতুন চাকরি পেয়েছেন। শুধু সফট স্কিল উল্লেখ করা জীবনবৃত্তান্তের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। গবেষণাটি অবশ্য চাকরি পাওয়ার কারণ হিসেবে কোনো একটি দক্ষতাকে সরাসরি প্রমাণ করে না; এটি জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা দক্ষতা ও পরবর্তী নিয়োগের মধ্যে একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক দেখেছে।
গবেষণায় নির্দিষ্ট কিছু প্রযুক্তিগত দক্ষতার উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে বেশি নিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এর মধ্যে ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন সফটওয়্যার ট্যাবলু, ডেটা অ্যানালাইসিস, পাইথন, এসকিউএল, গিট, জাভা, ডকার, পাওয়ার বিআই ও এক্সেলের মতো দক্ষতা ছিল। তবে কোন দক্ষতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা চাকরির ধরন ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের ওপর নির্ভর করে।
কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এআই-সম্পর্কিত ব্যবহারিক জ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর অর্থ প্রত্যেক প্রার্থীকে এআই ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে—এমন নয়। বরং নিজের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত এআই টুল ব্যবহার করে তথ্য বিশ্লেষণ, লেখা, গবেষণা, উপস্থাপনা, যোগাযোগ বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সহজ করার সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হতে পারে।
কেয়ারমাইন্ডসের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব সিভিতে কোনো না কোনো এআই দক্ষতার উল্লেখ ছিল, সেসব প্রার্থীর ২১ দশমিক ৩ শতাংশ নতুন চাকরি পেয়েছেন। এআই দক্ষতা উল্লেখ না করা সিভির ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ গবেষণার নমুনায় এআই দক্ষতা উল্লেখ করা ও চাকরি পাওয়ার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক দেখা গেছে।
এ গবেষণায় জেনারেটিভ এআই টুল—যেমন চ্যাটজিপিটি, কপাইলট বা প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং—ব্যবহারের দক্ষতাও আলাদাভাবে উঠে এসেছে। এসব দক্ষতা উল্লেখ করা প্রার্থীদের মধ্যে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ নতুন চাকরি পেয়েছেন।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সিভিতে কোনো টুলের নাম লিখলেই চাকরি নিশ্চিত হয় না। বাস্তবে সেই টুল কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, কী ধরনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং তার ফল কী ছিল—এসব দেখাতে পারলে দক্ষতার দাবিটি আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়।
বর্তমান কর্মক্ষেত্রে প্রায় সব খাতেই কোনো না কোনোভাবে তথ্য বা ডেটা ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যবসা, ব্যাংকিং, বিপণন, উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা কিংবা সরকারি সেবা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়।
এ কারণে ডেটা অ্যানালাইসিস, ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন, এক্সেল, এসকিউএল, পাওয়ার বিআই বা সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো দক্ষতা অনেক চাকরিতে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। কেয়ারমাইন্ডসের গবেষণাতেও ডেটা অ্যানালাইসিস, পাইথন, এসকিউএল ও ট্যাবলুর মতো দক্ষতা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ফলের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তবে সব চাকরির জন্য একই ধরনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন হয় না। একজন হিসাবরক্ষক, প্রকৌশলী, গ্রাফিক ডিজাইনার, বিক্রয়কর্মী বা প্রশাসনিক কর্মীর প্রয়োজনীয় দক্ষতার তালিকা এক হবে না। তাই চাকরিপ্রার্থীর উচিত নিজের কাঙ্ক্ষিত পেশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা বেছে নেওয়া।
প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি জটিল পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সমাধানে পৌঁছানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বিশ্লেষণী চিন্তাকে নিয়োগদাতাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল দক্ষতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের জরিপে প্রায় ১০টির মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠান এটিকে অপরিহার্য বলে বিবেচনা করেছে।
কর্মক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিলে শুধু সমস্যাটি চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা, তথ্য যাচাই করা, সম্ভাব্য সমাধানগুলো তুলনা করা এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো—এসব সক্ষমতাই একজন কর্মীকে কার্যকর করে তুলতে পারে।
তাই চাকরিপ্রার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক প্রজেক্ট, কেস স্টাডি বা নিজের ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারেন। এতে সিভিতে শুধু একটি দক্ষতার নাম না লিখে তার বাস্তব প্রয়োগও দেখানো সম্ভব হয়।
যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করা, নেতৃত্ব বা সমস্যা সমাধানের মতো সফট স্কিল এখনও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়। তবে কেবল সিভিতে ‘ভালো যোগাযোগ দক্ষতা’ বা ‘লিডারশিপ’ লিখে রাখলে তা প্রার্থীর সক্ষমতা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য দেয় না।
কেয়ারমাইন্ডসের গবেষণায় ‘কমিউনিকেশন’ ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দক্ষতাগুলোর একটি—১৬ দশমিক ৪ শতাংশ সিভিতে এটি উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ওই দক্ষতা উল্লেখ করা প্রার্থীদের নতুন চাকরি পাওয়ার হার ছিল ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। গবেষণাটি বলছে, সাধারণ সফট স্কিলের তুলনায় নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য দক্ষতা একজন প্রার্থীকে আলাদা করে চেনাতে বেশি কার্যকর হতে পারে।
অর্থাৎ একজন চাকরিপ্রার্থী যদি লেখেন—‘দলের নেতৃত্ব দিয়েছি’—তার চেয়ে কোন প্রকল্পে কতজনের দল পরিচালনা করেছেন, কী দায়িত্ব ছিল এবং কী ফলাফল এসেছে—এসব তথ্য দিলে দক্ষতাটি আরও স্পষ্ট হয়।
প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনের কারণে একই পেশাতেও সময়ের সঙ্গে কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। নতুন সফটওয়্যার, নতুন প্রক্রিয়া কিংবা নতুন দায়িত্ব দ্রুত শেখার সক্ষমতা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে স্থিতিস্থাপকতা, নমনীয়তা ও দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ মূল দক্ষতাগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কৌতূহল ও আজীবন শেখার মানসিকতাকেও আগামী বছরগুলোতে বাড়তে থাকা দক্ষতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কেয়ারমাইন্ডসের সিভি বিশ্লেষণেও ‘অ্যাডাপ্টেবিলিটি’ বা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা উল্লেখযোগ্য ফল দেখিয়েছে। গবেষণায় এই দক্ষতা উল্লেখ করা প্রার্থীদের ২০ দশমিক ৯ শতাংশ নতুন চাকরি পেয়েছেন।
চাকরির বাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব বাড়লেও মানবিক দক্ষতার প্রয়োজন কমছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না। বরং ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সৃজনশীল চিন্তা, নেতৃত্ব, সামাজিক প্রভাব, স্থিতিস্থাপকতা, কৌতূহল ও আজীবন শেখার মতো মানবিক দক্ষতাকেও ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এআই ও বিগ ডেটা, নেটওয়ার্ক ও সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতার মধ্যে থাকবে। একই সময়ে সৃজনশীল চিন্তা, নমনীয়তা ও অভিযোজনক্ষমতা এবং আজীবন শেখার মানসিকতার গুরুত্বও বাড়বে।
এ অবস্থায় নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো—শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করে থেমে না থেকে নিজের পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরি করা। প্রযুক্তি ব্যবহার, ডেটা বোঝা, সমস্যা বিশ্লেষণ, যোগাযোগ, দলগত কাজ এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা একসঙ্গে গড়ে তুলতে পারলে কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো সহজ হতে পারে।
সিভি তৈরির ক্ষেত্রেও তাই শুধু দক্ষতার তালিকা দেওয়ার পরিবর্তে কোথায়, কীভাবে এবং কোন ফলাফল অর্জনে সেই দক্ষতা ব্যবহার করা হয়েছে—তা তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান চাকরির বাজারে প্রার্থীর শুধু কী জানা আছে, তার পাশাপাশি তিনি সেই জ্ঞান বাস্তবে কীভাবে কাজে লাগাতে পারেন—সেটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।