আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : সোমবার ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা আতিকুর রহমান কয়েক মাস আগে রাতে বাসায় ফিরছিলেন। হাঁটাপথে মগবাজার এলাকায় একটি কুকুর তাঁকে কামড় দেয়। পরদিন সকালে তিনি ছুটে যান মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। নেন জলাতঙ্কের টিকা।
গত শনিবার আতিকুর জানান, তিনি এখন সুস্থ আছেন। এখন পর্যন্ত কোনো শারীরিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে।
জলাতঙ্কের আশঙ্কা থেকেই দ্রুত টিকা নিয়েছিলেন আতিকুর। আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল বা অন্য কোনো প্রাণীর কামড় কিংবা আঁচড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে জলাতঙ্কের ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। রোগটির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—লক্ষণ প্রকাশের পর এটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী। তাই আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা ও টিকা নেওয়াই প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকার গুরুত্বের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের নাম।
প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘একসঙ্গে আরও শক্তিশালী’।
১৮৮৫ সালে ফ্রান্সে জলাতঙ্ক ছিল ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। তখন এ রোগের কার্যকর কোনো চিকিৎসা বা টিকা ছিল না।
সে বছরের জুলাইয়ে আলসাস অঞ্চলের নয় বছর বয়সী জোসেফ মেইস্টারকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত একটি কুকুর ১৪ বার কামড় দেয়। সন্তানের অবস্থা দেখে প্রথমে ভেঙে পড়লেও মা মারি অ্যাঞ্জেলিক ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি জানতে পারেন, প্যারিসে জীবাণুবিদ লুই পাস্তুর জলাতঙ্কের টিকা নিয়ে গবেষণা করছেন। ছেলেকে নিয়ে তিনি প্যারিসে ছুটে যান।
সমস্যা ছিল, পাস্তুরের তৈরি টিকা তখনো কোনো মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়নি। এরপর চিকিৎসক জ্যাক জোসেফ গ্রঁশের পরামর্শ ও উৎসাহে মেইস্টারকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১০ দিনে শিশুটিকে ১৩টি ইনজেকশন দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত মেইস্টারের জলাতঙ্ক হয়নি। মানুষের ওপর পাস্তুরের জলাতঙ্কের টিকার প্রথম প্রয়োগ সফল হয়।
কয়েক মাস পর ১৫ বছর বয়সী রাখাল জ্যাঁ-বাতিস্ত জুপিলকেও জলাতঙ্ক আক্রান্ত একটি কুকুর আক্রমণ করে। তাকেও পাস্তুরের চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তিনি বেঁচে যান।
এরপর পাস্তুরের চিকিৎসার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জলাতঙ্কের চিকিৎসার জন্য প্যারিসে আসতে শুরু করে। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় আলাদা জলাতঙ্ক টিকাকেন্দ্র।
লুই পাস্তুরের জন্ম ১৮২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ফ্রান্সের দোলে শহরে। শুরুতে তিনি ছিলেন রসায়নবিদ। পরে তাঁর গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে জীবাণু, সংক্রমণ ও বিভিন্ন রোগ।
রেশম পোকার রোগ, মুরগির কলেরা ও অ্যানথ্রাক্স নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন তিনি। তাঁর গবেষণা থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়—নির্দিষ্ট জীবাণু রোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং কোনো জীবাণুর ক্ষমতা কমিয়ে শরীরে প্রবেশ করালে পরবর্তী সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
জলাতঙ্কের টিকা তৈরির গবেষণাতেও এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাস্তুরের সঙ্গে কাজ করেন এমিল রু, শার্ল শঁব্রলাঁ ও লুই থুইয়ের মতো বিজ্ঞানীরা। জলাতঙ্কে আক্রান্ত খরগোশের মেরুরজ্জু নিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা জীবাণুর কার্যক্ষমতা কমানোর পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন।
প্রথমে কুকুরের ওপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। পরে দেখা যায়, কুকুরের শরীরে জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এরপরই মানুষের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগের প্রশ্ন সামনে আসে।
মেইস্টারের ঘটনা সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়।
জলাতঙ্কের টিকার পাশাপাশি খাবার ও পানীয় নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রেও পাস্তুরের গবেষণার বড় অবদান রয়েছে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সের ওয়াইন ও বিয়ারশিল্পে উৎপাদিত পানীয় দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে পাস্তুর দেখতে পান, নির্দিষ্ট কিছু জীবাণু পানীয় নষ্ট হওয়ার জন্য দায়ী।
তিনি দেখান, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তরলকে কিছু সময় গরম করলে ক্ষতিকর অনেক অণুজীব ধ্বংস করা যায়। এরপর দ্রুত ঠান্ডা করলে পানীয়র গুণমানও অনেকটা বজায় থাকে।
এই পদ্ধতিই পরে ‘পাস্তুরাইজেশন’ বা ‘পাস্তুরীকরণ’ নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে দুধ, ফলের রসসহ বিভিন্ন পানীয় নিরাপদ রাখতে বিশ্বজুড়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাস্তুর ইনস্টিটিউট, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞান গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
পাস্তুরের জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কারের প্রায় দেড়শ বছর পরও বিশ্ব থেকে জলাতঙ্ক পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, প্রতিবছর বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়। এ রোগে মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনা এশিয়া ও আফ্রিকায় ঘটে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশে জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব বেশি, বাংলাদেশও তাদের একটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০১০ সালের আগে বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক দুই হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যেতেন।
পরিস্থিতি বদলাতে ২০১১ সালে সরকার ব্যাপকভাবে কুকুরকে জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকা দেওয়ার কর্মসূচি শুরু করে। পাশাপাশি কুকুরের কামড়ের পর আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা ও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকায় টানা তিন বছর অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকা দেওয়া গেলে ওই এলাকায় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এর ফলে দেশে জলাতঙ্কে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ২০১২ সালে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ২০০ জনে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে ৪২ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে মারা যান ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জন। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।
হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ে এখনই বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ না থাকলেও কুকুর নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষ ও কুকুরের মধ্যে জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন প্রাণীর কামড় কিংবা আঁচড়ের পর ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিতে হয়।
আতিকুর রহমানের মতো অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত টিকা নিয়ে সুস্থ জীবনযাপন করছেন। পাস্তুরের গবেষণার প্রায় দেড়শ বছর পরও তাঁর আবিষ্কারের সুফল পাচ্ছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।
১৮৭৬ সালে ইতালির মিলানে দেওয়া এক বক্তৃতায় পাস্তুর বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞানের কোনো দেশ নেই। জ্ঞান পুরো মানবজাতির সম্পদ।’
জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তাঁর সেই ভাবনারই যেন বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। প্যারিসে করা তাঁর গবেষণা আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের জীবন রক্ষা করছে।