জন্মের কয়েক ঘণ্টাতেই ছেলে-মেয়েশিশুর মনোযোগে পার্থক্য, নতুন গবেষণায় চমক

জন্মের কয়েক ঘণ্টাতেই ছেলে-মেয়েশিশুর মনোযোগে পার্থক্য, নতুন গবেষণায় চমক

সংগৃহীত

মানুষের আচরণ ও মানসিক বিকাশে জন্মগত বৈশিষ্ট্য কতটা প্রভাব ফেলে, আর পরিবেশ ও লালন-পালনের ভূমিকা কতটা—এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আলোচনা দীর্ঘদিনের। এবার জন্মের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছেলে ও মেয়েশিশুর মনোযোগের ধরনে গড়পড়তা পার্থক্যের ইঙ্গিত পেয়েছেন গবেষকেরা।

নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, একই সময়ে মানুষের মুখের ছবি ও একটি খেলনার ভিডিও দেখানো হলে নবজাতক মেয়েশিশুরা ছেলেশিশুদের তুলনায় মানুষের মুখের দিকে গড়ে বেশি সময় তাকিয়েছে। গবেষকদের মতে, মানুষের মুখের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই গড় পার্থক্যের সূচনা জীবনের একেবারে শুরুতেই হয়ে থাকতে পারে।

গবেষণাটিতে অংশ নেওয়া শিশুদের বয়স ছিল মাত্র আট ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ তিন দিন। ফলে তাদের আচরণে দীর্ঘ সময়ের সামাজিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক পরিবেশ কিংবা সাংস্কৃতিক প্রভাব কাজ করার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। এ কারণে গবেষকেরা জন্মগত বৈশিষ্ট্য কিংবা গর্ভাবস্থায় হরমোনের পার্থক্যের মতো জৈবিক কারণকে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অটিজম রিসার্চ সেন্টারের পিএইচডি গবেষক ইউমনা খান বলেন, আচরণে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য কখন শুরু হয় এবং এর পেছনে কী ধরনের কারণ কাজ করে, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। নতুন গবেষণাটি অন্তত কিছু আচরণগত পার্থক্য জীবনের একেবারে শুরুতেই দেখা দিতে পারে—এমন একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষণাটি পরিচালিত হয় কেমব্রিজের রোজি হাসপাতালে। এতে অংশ নেয় ১৩০ জন নবজাতক। তাদের বয়স ছিল আট ঘণ্টা থেকে তিন দিন। শিশুদের বাবা-মা বা পরিচর্যাকারীর কোলে বসিয়ে ল্যাপটপের পর্দায় দুটি ভিডিও পাশাপাশি দেখানো হয়।

একটি ভিডিওতে ছিল এক তরুণীর মুখ এবং অন্যটিতে ছিল ‘নিউটনের ক্রেডল’ নামের দোল খাওয়া ধাতব বলের খেলনা। আই-ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের চোখের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে কোন দৃশ্যের দিকে তারা কতক্ষণ তাকাচ্ছে, তা পরিমাপ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ছেলে ও মেয়ে—উভয় ধরনের নবজাতকই খেলনার তুলনায় তরুণীর মুখের ভিডিওর দিকে বেশি সময় তাকিয়েছে। তবে গড় হিসাবে মেয়েশিশুরা ছেলেশিশুদের তুলনায় মানুষের মুখের দিকে তুলনামূলক বেশি সময় মনোযোগ ধরে রেখেছে।

গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল ‘বায়োলজি অব সেক্স ডিফারেন্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই ফলাফলকে কোনোভাবেই প্রতিটি ছেলে বা মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একটি নিয়ম হিসেবে দেখা যাবে না। গবেষণাটি দুটি দলের গড় আচরণের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছে। ব্যক্তিভেদে শিশুদের আচরণে যথেষ্ট বৈচিত্র্য থাকতে পারে।

ভবিষ্যৎ বিকাশের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা

জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেখা দেওয়া এই ধরনের মনোযোগের পার্থক্য ভবিষ্যতে শিশুর আচরণ বা বিকাশকে নির্ধারণ করে দেয়—এমন কোনো প্রমাণ এই গবেষণায় পাওয়া যায়নি। বরং গবেষকেরা মনে করছেন, এটি শিশুর বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি সম্ভাব্য প্রবণতা মাত্র।

সাধারণভাবে মেয়েশিশুরা কিছু ভাষাগত ও সামাজিক দক্ষতা ছেলেশিশুদের তুলনায় কিছুটা আগে অর্জন করে—এমন পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ইউমনা খানের মতে, জন্মের সময় থেকেই সামাজিক উদ্দীপনার প্রতি মেয়েশিশুদের মনোযোগ কিছুটা বেশি থাকলে তা পরবর্তী বিকাশের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করে গবেষণা করা প্রয়োজন।

গবেষকেরা আরও জানতে চাইছেন, জীবনের একেবারে শুরুতে দেখা দেওয়া মনোযোগের এই ধরনের পার্থক্যের সঙ্গে পরবর্তী স্নায়ুবিক বিকাশের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না। বিশেষ করে অটিজম, এডিএইচডি, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মতো বিভিন্ন স্নায়ুবিক ও মানসিক অবস্থার সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি যে নবজাতকের মানুষের মুখের দিকে তাকানোর প্রবণতার পার্থক্য ভবিষ্যতে এসব অবস্থার কারণ হতে পারে।

হরমোনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

জন্মের সময় ছেলে ও মেয়েশিশুর আচরণ বা মস্তিষ্কের বিকাশে গড়পড়তা পার্থক্যের পেছনে গর্ভকালীন হরমোনের ভূমিকা থাকতে পারে—এমন ধারণা আগে থেকেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছে।

আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থার প্রথম ও দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ছেলে ভ্রূণ মেয়েশিশুর তুলনায় বেশি মাত্রায় টেস্টোস্টেরনের সংস্পর্শে আসে। এই হরমোনগত পার্থক্য মস্তিষ্কের বিকাশ ও পরবর্তী মনোযোগের ধরনে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, সেটি এখনো গবেষণার বিষয়।

তবে শুধু জন্মগত বা হরমোনগত কারণ দিয়ে শিশুর আচরণ ব্যাখ্যা করা যায় না। জন্মের পর পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং লালন-পালন শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশ—দুইয়ের প্রভাব আলাদা করে নির্ধারণ করা একটি জটিল বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।

নতুন গবেষণার ফলাফল তাই ছেলে ও মেয়েশিশুর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট আচরণগত পার্থক্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে না। বরং এটি এমন একটি সম্ভাবনার দিকে গবেষকদের দৃষ্টি দিচ্ছে যে, মানুষের সামাজিক মনোযোগের কিছু গড় পার্থক্যের ভিত্তি হয়তো জন্মের পরপরই দেখা যেতে পারে। এ বিষয়ে আরও বড় পরিসরে এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের অনুসরণ করে গবেষণা করলেই বিষয়টি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।