ক্রনিক কোমর ব্যথা কমাতে সাঁতার কতটা কার্যকর

ক্রনিক কোমর ব্যথা কমাতে সাঁতার কতটা কার্যকর

সংগৃহীত

দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক কোমর ব্যথা বিশ্বজুড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত করার অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যায় ভোগা মানুষ ব্যথা কমাতে নানা ধরনের চিকিৎসা ও ব্যায়ামের সাহায্য নেন। এর মধ্যে সাঁতার ও জলজ ব্যায়ামকে কম-ঝুঁকির শারীরিক কার্যক্রম হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচনা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রকাশনা ভেরিওয়েল হেলথে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রনিক কোমর ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সাঁতার উপকারী হতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও সাঁতারের মাধ্যমে কোমর ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্যথা ও চলাচলের সক্ষমতায় উন্নতির তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে British Journal of Sports Medicine-এ। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটির পোস্টডক্টরাল রিসার্চ ফেলো ড. ডেবোরা ওয়ারহামের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটিতে অন্তত ১২ সপ্তাহ ধরে কোমর ব্যথায় ভুগছিলেন এমন ৭৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন।

অংশগ্রহণকারীদের জন্য আট সপ্তাহের একটি নির্দেশিত সাঁতার কর্মসূচির পাশাপাশি ক্রনিক ব্যথা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, কর্মসূচি শেষে অংশগ্রহণকারীদের ব্যথার মাত্রা কমার পাশাপাশি দৈনন্দিন চলাফেরার সক্ষমতায়ও উন্নতি হয়েছে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, আট সপ্তাহের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের অক্ষমতার স্কোরে গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ উন্নতি দেখা যায়। একই সঙ্গে কোমর ব্যথা নিজে সামলানোর বিষয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে।

পানিতে ব্যায়াম কেন স্বস্তিদায়ক

শক্ত মাটিতে ব্যায়াম করার সময় শরীরের জয়েন্ট ও পেশিতে তুলনামূলক বেশি চাপ পড়ে। কিন্তু পানির প্লাবতা শরীরের ওজনের একটি অংশ বহন করে নেয়। ফলে পানিতে শরীরের ওপর চাপ কম পড়ে এবং অনেকের জন্য নড়াচড়া করা তুলনামূলক সহজ হয়।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরাও জানিয়েছেন, পানির মধ্যে তারা ভূমির তুলনায় সহজে ও স্বাচ্ছন্দ্যে অঙ্গসঞ্চালন করতে পেরেছেন।

নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের ফলে শুধু ব্যথার অনুভূতিই নয়, দৈনন্দিন কাজকর্মেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যেমন—হাঁটাচলা, চেয়ার থেকে ওঠা, ঘরের কাজ করা এবং ঘুমের ক্ষেত্রে স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব

দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সঙ্গে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশার সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।

সাঁতারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উপকার পাওয়ার তথ্য রয়েছে। তবে কোমর ব্যথা কমানোর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

সুফল স্থায়ী নাও হতে পারে

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এক বছর বা ৫২ সপ্তাহ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, আট সপ্তাহের কাঠামোবদ্ধ সাঁতার কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর সময়ের সঙ্গে এর কিছু সুফল ধীরে ধীরে কমে আসে।

এ থেকে গবেষকরা মনে করছেন, সাঁতার ক্রনিক কোমর ব্যথা ব্যবস্থাপনায় সহায়ক একটি পদ্ধতি হতে পারে; তবে এটিকে একমাত্র বা স্থায়ী চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সবার জন্য সাঁতার নিরাপদ নয়

সাঁতার অনেকের জন্য উপকারী হলেও সবার ক্ষেত্রে এটি উপযুক্ত নাও হতে পারে। বিশেষ করে যারা সাঁতার জানেন না বা যাদের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত জটিলতা রয়েছে, তাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ডায়রিয়া, মৃগীরোগ, হৃদরোগ বা ফুসফুসের জটিলতা থাকলে সাঁতার শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একইভাবে ক্যান্সারের চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সুইমিং পুল ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কীভাবে শুরু করবেন

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে ব্যক্তিভিত্তিক ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের সাঁতার সেশন নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে সাঁতারের দূরত্ব ও তীব্রতা বাড়ানো হয়।

তাই দীর্ঘদিনের কোমর ব্যথায় আক্রান্ত কেউ সাঁতার শুরু করতে চাইলে নিজের শারীরিক সক্ষমতা ও ব্যথার ধরন বিবেচনায় চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো। শুরুতেই বেশি সময় বা বেশি তীব্রতায় সাঁতার না কেটে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করা নিরাপদ পদ্ধতি হতে পারে।

সাঁতার ক্রনিক কোমর ব্যথার চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং উপযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটি ব্যায়াম ও ব্যথা ব্যবস্থাপনার একটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।