বাংলাদেশে বাড়ছে অকালমৃত্যু, নেপথ্যে হৃদরোগ-স্ট্রোকসহ অসংক্রামক রোগ

বাংলাদেশে বাড়ছে অকালমৃত্যু, নেপথ্যে হৃদরোগ-স্ট্রোকসহ অসংক্রামক রোগ

সংগৃহীত

দুপুরে কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হঠাৎ শরীর খারাপ। ঘাড় ও হাত-পায়ে ব্যথা, বমিভাব, মাথা ঝিমঝিম—প্রাথমিকভাবে গুরুতর কিছু মনে হয়নি। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয় ৪২ বছর বয়সী মুকসেমুল হাকিমকে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হৃদরোগ বা স্ট্রোকের মতো গুরুতর কোনো সমস্যা যে শরীরে নীরবে তৈরি হচ্ছিল, তা বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যু হয় তার।

এ ধরনের ঘটনা এখন আর খুব একটা বিরল নয়। কর্মব্যস্ত জীবনে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকা অনেক মানুষই হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কখনো কর্মস্থলে, কখনো বাসায় কিংবা চলার পথে ঘটে যাচ্ছে আকস্মিক মৃত্যু। এসব ঘটনার পেছনে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার ও কিডনি জটিলতার মতো অসংক্রামক রোগের ভূমিকা রয়েছে বলে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। স্ট্রোক, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারের মতো রোগগুলো এ মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এসব রোগের একটি বড় অংশ আবার দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করতে পারে। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই অনেকের শারীরিক অবস্থা জটিল পর্যায়ে চলে যায়।

অসংক্রামক রোগকে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি রোগও বলা হয়। জিনগত বৈশিষ্ট্য, বয়স, শারীরিক অবস্থা, পরিবেশ এবং জীবনযাপনের নানা অভ্যাসের সম্মিলিত প্রভাবে এসব রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শুধু বয়স্ক মানুষ নয়, তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যেও এসব রোগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট গবেষণা ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে অকালমৃত্যু ঠেকাতে রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

হার্ট অ্যাটাক: সতর্ক হওয়ার সুযোগ খুব কম

অকালমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হৃদরোগ। বিশেষ করে করোনারি আর্টারি ডিজিজ, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিউরের মতো সমস্যার প্রবণতা বাড়ছে বলে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

হার্টে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে হৃদপেশিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এ জন্য আগে থেকেই গুরুতর অসুস্থ থাকতে হবে—এমনটি নয়। আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষও হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের শিকার হতে পারেন।

হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা। এই ব্যথা হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব, বমি কিংবা পেটে তীব্র অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। কারণ হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রোকে ‘সময়’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

হৃদরোগের পাশাপাশি স্ট্রোকও মৃত্যুর বড় কারণ। হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে অনেক সময় স্ট্রোককে এক করে দেখা হলেও দুটির প্রকৃতি আলাদা। হার্ট অ্যাটাক হয় মূলত হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে। আর স্ট্রোকের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে ক্ষতি হতে পারে।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে আক্রান্ত মস্তিষ্কের অংশ এবং ক্ষতির পরিমাণের ওপর রোগীর অবস্থা নির্ভর করে। তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। যত দ্রুত রোগী হাসপাতালে পৌঁছাবেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু হবে, তত বেশি ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে।

স্ট্রোকের সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, হাত ওপরে তুলতে না পারা, মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা এবং শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।

এ ছাড়া ঢোক গিলতে সমস্যা, বমি বমি ভাব বা বমি, খিঁচুনি কিংবা হঠাৎ জ্ঞান হারানোর মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণের কোনোটি হঠাৎ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

ডায়াবেটিসেও বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের তালিকায় ডায়াবেটিসও বড় উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা এক কোটি ৩৮ লাখের বেশি। রোগীর মোট সংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে বলে সংস্থাটির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

আইডিএফের অনুমান অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দুই কোটি ২৩ লাখে পৌঁছাতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজের ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানেন না। আইডিএফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ রোগটি শনাক্ত হওয়ার বাইরে রয়েছেন।

অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন বিষয় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। নিয়মিত পরীক্ষা না করলে অনেক সময় রোগটি শনাক্ত হতে দেরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের ২০২২ সালের এক গবেষণাতেও তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিসের উপস্থিতির বিষয়টি উঠে আসে। গবেষণায় ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রতি ১০০ জন তরুণ-তরুণীর মধ্যে সাতজনের ডায়াবেটিস পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্বাসতন্ত্রের রোগেও বড় ঝুঁকি

দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, বিশেষ করে অ্যাজমা ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি, দীর্ঘদিন ধরে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। অনেক রোগী নিজের সমস্যার বিষয়ে জানতে পারেন তখন, যখন শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা অনেকটাই বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশে এসব রোগের সঙ্গে ধূমপান এবং ঘরে কাঠ, লাকড়ি, গোবর বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত ধোঁয়া দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘদিনের কাশি, বুক ভার লাগা কিংবা সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গকে অনেকেই স্বাভাবিক সমস্যা হিসেবে এড়িয়ে যান। অথচ দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

ক্যানসারেও বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা

বাংলাদেশে অকালমৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ ক্যানসার। পরিসংখ্যান ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং এক লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে।

দেশে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যানসার এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া পাকস্থলী ও কণ্ঠনালীর ক্যানসারও মৃত্যুর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেও বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী নতুন করে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসা শুরু করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের ক্ষেত্রে রোগের ধরন অনুযায়ী দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার সুযোগ বাড়ে। কিন্তু রোগের লক্ষণকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে চিকিৎসা জটিল হয়ে যেতে পারে।

কেন বাড়ছে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় অকালমৃত্যুর ঝুঁকির পেছনে কয়েকটি বিষয় বারবার উঠে আসে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ব্যবহার, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং বায়ুদূষণ এসব রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সমস্যার আরেকটি দিক হলো—অনেক মানুষ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন না। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে তারা জানতে পারেন না। কোনো একটি গুরুতর উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে গেলে তখন রোগ অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, অকালমৃত্যু কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।

সচেতনতাই হতে পারে প্রথম প্রতিরোধ

অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের শুরু হতে পারে দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকেই। ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে থাকা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনো বড় উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। তাই শুধু অসুস্থ বোধ করার সময় নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা দরকার।

হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো জরুরি অবস্থায় সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ ধরনের রোগে চিকিৎসা শুরু হতে যত দেরি হয়, জটিলতার আশঙ্কাও তত বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বিস্তার মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ অকালমৃত্যু কমানোর লড়াই শুধু হাসপাতালের নয়—এটি শুরু করতে হয় রোগ হওয়ার আগেই।

আনন্দ বাংলা ডেস্ক

দুপুরে কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হঠাৎ শরীর খারাপ। ঘাড় ও হাত-পায়ে ব্যথা, বমিভাব, মাথা ঝিমঝিম—প্রাথমিকভাবে গুরুতর কিছু মনে হয়নি। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয় ৪২ বছর বয়সী মুকসেমুল হাকিমকে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হৃদরোগ বা স্ট্রোকের মতো গুরুতর কোনো সমস্যা যে শরীরে নীরবে তৈরি হচ্ছিল, তা বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যু হয় তার।

এ ধরনের ঘটনা এখন আর খুব একটা বিরল নয়। কর্মব্যস্ত জীবনে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকা অনেক মানুষই হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কখনো কর্মস্থলে, কখনো বাসায় কিংবা চলার পথে ঘটে যাচ্ছে আকস্মিক মৃত্যু। এসব ঘটনার পেছনে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার ও কিডনি জটিলতার মতো অসংক্রামক রোগের ভূমিকা রয়েছে বলে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। স্ট্রোক, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারের মতো রোগগুলো এ মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এসব রোগের একটি বড় অংশ আবার দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করতে পারে। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই অনেকের শারীরিক অবস্থা জটিল পর্যায়ে চলে যায়।

অসংক্রামক রোগকে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি রোগও বলা হয়। জিনগত বৈশিষ্ট্য, বয়স, শারীরিক অবস্থা, পরিবেশ এবং জীবনযাপনের নানা অভ্যাসের সম্মিলিত প্রভাবে এসব রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শুধু বয়স্ক মানুষ নয়, তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যেও এসব রোগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট গবেষণা ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে অকালমৃত্যু ঠেকাতে রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

হার্ট অ্যাটাক: সতর্ক হওয়ার সুযোগ খুব কম

অকালমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হৃদরোগ। বিশেষ করে করোনারি আর্টারি ডিজিজ, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিউরের মতো সমস্যার প্রবণতা বাড়ছে বলে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

হার্টে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে হৃদপেশিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এ জন্য আগে থেকেই গুরুতর অসুস্থ থাকতে হবে—এমনটি নয়। আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষও হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের শিকার হতে পারেন।

হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা। এই ব্যথা হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব, বমি কিংবা পেটে তীব্র অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। কারণ হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রোকে ‘সময়’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

হৃদরোগের পাশাপাশি স্ট্রোকও মৃত্যুর বড় কারণ। হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে অনেক সময় স্ট্রোককে এক করে দেখা হলেও দুটির প্রকৃতি আলাদা। হার্ট অ্যাটাক হয় মূলত হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে। আর স্ট্রোকের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে ক্ষতি হতে পারে।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে আক্রান্ত মস্তিষ্কের অংশ এবং ক্ষতির পরিমাণের ওপর রোগীর অবস্থা নির্ভর করে। তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। যত দ্রুত রোগী হাসপাতালে পৌঁছাবেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু হবে, তত বেশি ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে।

স্ট্রোকের সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, হাত ওপরে তুলতে না পারা, মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা এবং শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।

এ ছাড়া ঢোক গিলতে সমস্যা, বমি বমি ভাব বা বমি, খিঁচুনি কিংবা হঠাৎ জ্ঞান হারানোর মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণের কোনোটি হঠাৎ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

ডায়াবেটিসেও বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের তালিকায় ডায়াবেটিসও বড় উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা এক কোটি ৩৮ লাখের বেশি। রোগীর মোট সংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে বলে সংস্থাটির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

আইডিএফের অনুমান অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দুই কোটি ২৩ লাখে পৌঁছাতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজের ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানেন না। আইডিএফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ রোগটি শনাক্ত হওয়ার বাইরে রয়েছেন।

অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন বিষয় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। নিয়মিত পরীক্ষা না করলে অনেক সময় রোগটি শনাক্ত হতে দেরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের ২০২২ সালের এক গবেষণাতেও তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিসের উপস্থিতির বিষয়টি উঠে আসে। গবেষণায় ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রতি ১০০ জন তরুণ-তরুণীর মধ্যে সাতজনের ডায়াবেটিস পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্বাসতন্ত্রের রোগেও বড় ঝুঁকি

দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, বিশেষ করে অ্যাজমা ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি, দীর্ঘদিন ধরে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। অনেক রোগী নিজের সমস্যার বিষয়ে জানতে পারেন তখন, যখন শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা অনেকটাই বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশে এসব রোগের সঙ্গে ধূমপান এবং ঘরে কাঠ, লাকড়ি, গোবর বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত ধোঁয়া দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘদিনের কাশি, বুক ভার লাগা কিংবা সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গকে অনেকেই স্বাভাবিক সমস্যা হিসেবে এড়িয়ে যান। অথচ দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

ক্যানসারেও বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা

বাংলাদেশে অকালমৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ ক্যানসার। পরিসংখ্যান ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং এক লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে।

দেশে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যানসার এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া পাকস্থলী ও কণ্ঠনালীর ক্যানসারও মৃত্যুর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেও বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী নতুন করে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসা শুরু করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের ক্ষেত্রে রোগের ধরন অনুযায়ী দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার সুযোগ বাড়ে। কিন্তু রোগের লক্ষণকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে চিকিৎসা জটিল হয়ে যেতে পারে।

কেন বাড়ছে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় অকালমৃত্যুর ঝুঁকির পেছনে কয়েকটি বিষয় বারবার উঠে আসে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ব্যবহার, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং বায়ুদূষণ এসব রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সমস্যার আরেকটি দিক হলো—অনেক মানুষ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন না। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে তারা জানতে পারেন না। কোনো একটি গুরুতর উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে গেলে তখন রোগ অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, অকালমৃত্যু কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।

সচেতনতাই হতে পারে প্রথম প্রতিরোধ

অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের শুরু হতে পারে দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকেই। ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে থাকা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনো বড় উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। তাই শুধু অসুস্থ বোধ করার সময় নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা দরকার।

হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো জরুরি অবস্থায় সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ ধরনের রোগে চিকিৎসা শুরু হতে যত দেরি হয়, জটিলতার আশঙ্কাও তত বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বিস্তার মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ অকালমৃত্যু কমানোর লড়াই শুধু হাসপাতালের নয়—এটি শুরু করতে হয় রোগ হওয়ার আগেই।