আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : রবিবার ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
ঢাকাই চলচ্চিত্রের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের নিজ বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই মৃত্যু ঘিরে তিন দশক ধরে চলছে রহস্য, তদন্ত ও আইনি লড়াই।
একাধিক তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও শুরু থেকেই তার পরিবার দাবি করে আসছে, তাকে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি আবারও হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের আওতায় আসে।
আর এই মামলায় ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হয়েছেন সালমান শাহর একসময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডন। ফলে পুরোনো সেই বন্ধুত্বের সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের নিজ ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন তিনি ছিলেন দেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক। তার আকস্মিক মৃত্যুতে শোক নেমে আসে পুরো চলচ্চিত্রাঙ্গনে।
প্রথমে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যু মামলা করেন। তবে পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।
হত্যার অভিযোগ তদন্তে সিআইডিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে সিআইডি। প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে ওই প্রতিবেদন মেনে নেয়নি তার পরিবার। শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই।
সিআইডির প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তির পর ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়।
প্রায় ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সেখানেও সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সালমান শাহর বাবা মারা যাওয়ার পর আইনি লড়াই চালিয়ে যান তার মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে নারাজি দেন।
তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ছেলেকে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। এরপর মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় র্যাবকে।
তবে ২০১৬ সালে আদালতের নির্দেশে র্যাবের তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআইকে।
চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
প্রতিবেদনে ৫৪ জনের সাক্ষ্য এবং জব্দ করা আলামত বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পিবিআইয়ের তদন্তেও সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেন।
কিন্তু এরপরও থামেনি সালমান শাহর পরিবারের আইনি লড়াই।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদের অভিযোগ এবং রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।
এরপর রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা করা হয়।
মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়।
সালমান শাহ ও ডনের বন্ধুত্ব ছিল চলচ্চিত্রাঙ্গনে আলোচিত। ২০২০ সালে পিবিআই হত্যার অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানালে ডন স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন।
তখন তিনি দাবি করেছিলেন, দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অপবাদ তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে।
কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে পাল্টে যায় পরিস্থিতি।
২০২৬ সালে সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন ডন। বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং জামিনও নামঞ্জুর করা হয়।
মামলার বাদী সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুমের দাবি, রিজভী নামে এক আসামির বক্তব্যে ডনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে ডন এখনো কেবল হত্যা মামলার আসামি। আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। মামলার তদন্তও এখনো চলমান।
তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, তদন্ত চলছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পরও প্রশ্নটির চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি—তিনি কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল?
একাধিক তদন্তে আত্মহত্যার কথা উঠে এসেছে। আবার পরিবারের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ঘটনাটি এখন নতুন করে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তাধীন।
সর্বশেষ আদালত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করেছেন।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী এখনো ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের অপেক্ষায়। তার প্রত্যাশা, আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে সত্য।
তবে তিন দশক পেরিয়ে সালমান শাহর মৃত্যুর সেই রহস্যের শেষ অধ্যায় কী—তার উত্তর এখন নির্ভর করছে চলমান তদন্ত ও আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর।