আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : শনিবার ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
শরীরে রক্তে থাকা গ্লুকোজ কোষে পৌঁছে শক্তি হিসেবে ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ইনসুলিন। অগ্ন্যাশয় থেকে তৈরি এই হরমোনের প্রতি শরীরের কোষগুলো যখন স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তাকে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন প্রতিরোধ।
এটি নিজে ডায়াবেটিস নয়। তবে দীর্ঘদিন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে এবং পরবর্তী সময়ে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেরই কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না।
ইনসুলিনের কাজ হলো রক্ত থেকে গ্লুকোজ শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়লে গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে বাধার মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় শরীরের ঘাটতি পূরণ করতে অগ্ন্যাশয় বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে পারে। কিছু সময় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না-ও পারে। তখন রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে শুরু করে।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের পেছনে সাধারণত একটি মাত্র কারণ কাজ করে না। বংশগত প্রবণতা, জীবনযাপন ও বিভিন্ন শারীরিক অবস্থার সমন্বয়ে এ সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ঝুঁকি বাড়াতে পারে—
তবে এসব ঝুঁকির কারণ থাকলেই যে কারও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হবে, এমন নয়।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—শুরুর দিকে এটি অনেক সময় নীরব থাকে। অর্থাৎ শরীরে পরিবর্তন চললেও ব্যক্তি নিজেকে অসুস্থ মনে নাও করতে পারেন।
পরিস্থিতি আরও এগিয়ে গেলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে—
তবে এসব লক্ষণ শুধু ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের জন্য হয় না। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাতেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই কেবল লক্ষণের ভিত্তিতে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে অ্যাকান্থোসিস নাইগ্রিকানস নামের একটি ত্বকের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এতে ঘাড়, বগল বা কুঁচকির মতো জায়গার ত্বক কালচে, পুরু ও মখমলের মতো হয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া একাধিক স্কিন ট্যাগ এবং কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত মেদও বিপাকীয় ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স নিশ্চিত হয় না।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও ডায়াবেটিস এক বিষয় নয়। একজন ব্যক্তির ডায়াবেটিস হওয়ার বহু আগেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকতে পারে।
প্রথমদিকে অগ্ন্যাশয় অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে।
গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও ডায়াবেটিসের পর্যায়ে না পৌঁছালে তাকে প্রিডায়াবেটিস বলা হয়। এ পর্যায় থেকে কিছু মানুষের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে প্রিডায়াবেটিস, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের অস্বাভাবিকতা এবং ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।
এ ছাড়া হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত হতে পারে।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স শনাক্ত করার জন্য সবার ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য একটি নির্দিষ্ট একক পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক সাধারণত রোগীর স্বাস্থ্য ইতিহাস, শারীরিক অবস্থা এবং বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করেন।
প্রয়োজনে পরীক্ষা হিসেবে থাকতে পারে—
রক্তচাপ, ওজন ও কোমরের পরিধির মতো বিষয়ও চিকিৎসক মূল্যায়ন করতে পারেন।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ব্যবস্থাপনায় জীবনযাপনের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, সুষম খাবার, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এসব অভ্যাস ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওজন কমানোর উদ্যোগও উপকারী হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই খাদ্যতালিকা প্রযোজ্য নয়। তবে সাধারণভাবে কম প্রক্রিয়াজাত ও পুষ্টিকর খাবারের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।
খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন—
অন্যদিকে চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, পরিশোধিত শর্করা এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করা ভালো।
শারীরিক কার্যকলাপ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পেশি গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে।
এরোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি রেজিস্ট্যান্স বা শক্তিবর্ধক ব্যায়ামও উপকারী হতে পারে। তবে যাদের আগে থেকেই কোনো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের নতুন বা কঠিন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অনেকেই মনে করেন শুধু অতিরিক্ত ওজনের মানুষেরই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়। বিষয়টি এমন নয়। অতিরিক্ত ওজন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হলেও স্বাভাবিক ওজনের ব্যক্তিরও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হতে পারে।
বংশগত কারণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ঘুমের সমস্যা, হরমোনজনিত অবস্থা এবং অন্যান্য বিপাকীয় কারণও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবারে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিক হলে, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে কিংবা অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ঘনঘন প্রস্রাবের মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ঘাড় বা শরীরের ভাঁজে অস্বাভাবিক কালচে ও পুরু ত্বক দেখা দিলেও বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স অনেক সময় নীরবে তৈরি হয়। তাই শরীরে কোনো বড় উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আছে কি না, তা শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।