আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : শনিবার ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ ভার্সন কিংবা ইংরেজি মাধ্যম—শিক্ষার মাধ্যম আলাদা হলেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান, দক্ষতা ও মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বাংলা ও ইংরেজি উভয় মাধ্যমের পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অক্সফোর্ড একিউএ ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস আয়োজিত ‘স্কুল লিডারস কনফারেন্স ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু মাধ্যমভিত্তিক বিভাজন কমানো নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন জাতীয় ভিত্তি তৈরির পরিকল্পনা। অর্থাৎ কোনো শিক্ষার্থী বাংলা মাধ্যমে পড়ছে, ইংরেজি ভার্সনে পড়ছে কিংবা ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে পড়ছে—শিক্ষার মাধ্যম ভিন্ন হলেও তার মৌলিক দক্ষতা, জ্ঞান ও শেখার সুযোগে বড় ধরনের ব্যবধান যেন না থাকে, সেটিই হবে সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন ধারার শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন পাঠ্যক্রম, শিক্ষা পদ্ধতি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধার মধ্যে বেড়ে ওঠে। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের অনেক প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং বিভিন্ন কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষার চর্চা থাকলেও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এই বাস্তবতায় একটি অভিন্ন জাতীয় ন্যূনতম মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন প্রতিমন্ত্রী।
ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষার্থীরা যে মাধ্যমেই পড়াশোনা করুক না কেন, তাদের প্রাথমিক জ্ঞান, দক্ষতা ও মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন ও জাতীয় ন্যূনতম মানদণ্ড নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘কোন মাধ্যমে পড়ছে’—এর চেয়ে ‘কী মানের শিক্ষা পাচ্ছে’—এই প্রশ্নটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করলেই শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না—এ বিষয়টিও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। শ্রেণিকক্ষের আয়তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ে কার্যকর পাঠদানের সময় নির্ধারণের মতো বিষয়গুলোকে নীতিগত কাঠামোর মধ্যে আনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
কারণ একই পাঠ্যক্রম থাকলেও যদি একটি শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকে, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকে কিংবা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও অবকাঠামোর ঘাটতি থাকে, তাহলে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
এ কারণে ভবিষ্যৎ সংস্কারে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যালয়ের বাস্তব পরিবেশকেও গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
শিক্ষার মান উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি শিক্ষকতা। এ জায়গাতেও পরিবর্তনের কথা বলেছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে দায়িত্ব না দেওয়ার মতো নীতিগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কারিকুলাম বা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি চালু করলেও শিক্ষকরা যদি সেই পদ্ধতির সঙ্গে যথাযথভাবে পরিচিত না হন, তাহলে সংস্কারের সুফল শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানো কঠিন। ফলে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে কেবল আনুষ্ঠানিক কর্মশালা হিসেবে না দেখে ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় শিক্ষক প্রশিক্ষণকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারি-বেসরকারি উভয় ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানের পার্থক্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহৃত কিছু আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে চায় সরকার।
প্রতিমন্ত্রী ভবিষ্যৎ পাঠ্যক্রমে বাস্তবমুখী কার্যক্রম ও খেলাধুলার মাধ্যমে শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোর কার্যকর লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এলএমএস ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
এর অর্থ, শিক্ষা ব্যবস্থার একটি ধারায় কার্যকর কোনো পদ্ধতি থাকলে সেটিকে অন্য ধারায়ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি করা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য হবে কোনো একটি মাধ্যমকে অন্যটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় কার্যকর পদ্ধতিগুলো চিহ্নিত করে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় সেগুলোর উপযোগী প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
শিক্ষাব্যবস্থার বৈশ্বিক মান নিয়ে নিজের আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরেছেন ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু বিশ্বের সেরা চর্চাগুলো অনুসরণ করতে চাই না, একদিন বাংলাদেশ থেকেই যেন বিশ্বের অন্য দেশগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার সেরা চর্চা অনুসরণ করে, এটাই আমাদের স্বপ্ন।’
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, সময় ও শ্রম দেওয়ার জন্য সরকার প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
তবে আন্তর্জাতিক মানে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় করা। কারিকুলাম পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষক প্রস্তুতি, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণ, প্রযুক্তির সুযোগ এবং নিয়মিত মূল্যায়ন—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
শিক্ষাক্রম সংস্কারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের সময় কেউ যাতে বলতে না পারেন যে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে চান তারা। শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও মতামত নিয়েই সামনে এগোতে চায় সরকার।
এক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য অংশীজনের মতামত নেওয়া হলে নতুন কারিকুলাম বাস্তবতার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের শেখার চাপ, পরীক্ষানির্ভরতা, ব্যবহারিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হলে কারিকুলাম সংস্কার আরও কার্যকর হতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অবকাঠামো, অর্থায়ন, শিক্ষকসংখ্যা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় যে পার্থক্য রয়েছে, তা কমানো সহজ নয়।
তবে সরকারের পরিকল্পনায় শুধু পাঠ্যক্রমে সামঞ্জস্য নয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পেশাগত শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের জুনেও ইংলিশ-মিডিয়াম স্কুলগুলোকে একটি অভিন্ন নীতিমালার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী।
ফলে শনিবারের বক্তব্যকে শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন ধারাকে একটি বৃহত্তর নীতিগত কাঠামোর মধ্যে আনার ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে পরিকল্পনা ঘোষণার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এর বাস্তবায়ন। বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রমে কী ধরনের সামঞ্জস্য আনা হবে, কোন বিষয়গুলোকে জাতীয় ন্যূনতম মানদণ্ডের আওতায় আনা হবে, ইংরেজি মাধ্যমের আন্তর্জাতিক কারিকুলামের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষার লক্ষ্য কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব প্রশ্নের বিস্তারিত কাঠামো এখনও সামনে আসেনি।
একইভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মানদণ্ড, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ সংখ্যা, অবকাঠামোর ন্যূনতম শর্ত এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহি। সেই জায়গায় সরকার কতটা কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য কাঙ্ক্ষিত সমতা কতটা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
অক্সফোর্ড একিউএ’র বাংলাদেশ ও নেপালের কান্ট্রি ডিরেক্টর শাহীন রেজার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন।
এ ছাড়া ব্রিটিশ হাইকমিশন ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রতিনিধি এবং রাজধানীর বিভিন্ন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষরা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় ন্যূনতম মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার যে বার্তা সরকার দিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের বহুধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনা কতটা স্পষ্ট, অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।