আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : রবিবার ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর চালু করা ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ ওয়েবসাইট।
পাঠদানের মান, পেশাদারিত্ব ও একাডেমিক আচরণ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চালু করা ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামের একটি ওয়েবসাইটে এ মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সেখানে শিক্ষকদের বিভিন্ন মানদণ্ডে রেটিংও দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ডাকসুর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক ও প্রশাসন এর এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। ডাকসুর উদ্যোগে প্রকাশ্য রেটিং ব্যবস্থা চালু করায় এর অপব্যবহার ও রাজনীতিকরণের আশঙ্কাও রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
গত বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ডাকসু ভবনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ওয়েবসাইটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ডাকসুর নেতারা। ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে ওয়াসাতুন রাফিয়ার তত্ত্বাবধানে এটি চালু করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উম্মে ওয়াসাতুন রাফিয়া বলেন, ডাকসুর নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও বিষয়টির প্রশাসনিক সমাধান না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে।
ডাকসু নেতারা জানিয়েছেন, তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে।
ওয়েবসাইটটিতে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ১৫টি নির্দিষ্ট বিষয় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারিত্ব এবং সার্বিক সন্তুষ্টি।
এ ছাড়া শিক্ষক কতটা স্পষ্টভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় উৎসাহ দেন কি না, শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং সময়মতো ক্লাস নেন কি না—এসব বিষয়েও মতামত দিতে পারছেন শিক্ষার্থীরা।
ডাকসুর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিতে পারছেন। একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধনের পর ওই ঠিকানায় পাঠানো কোড ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে হচ্ছে। এরপর শিক্ষার্থীরা শুধু নিজ বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারছেন। মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ওয়েবসাইটের তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬টি বিভাগের ২ হাজার ৪৫ জন শিক্ষককে ৪ হাজার ৮৭৯ জন শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করেছেন। মোট রিভিউ জমা পড়েছে ৯ হাজার ৩৮২টি। এর মধ্যে ৭০৮ জন শিক্ষকের রেটিং ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ৭০৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ৪ থেকে ৫ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ৩১২ জন, ৩ থেকে ৪-এর মধ্যে ১৭৪ জন, ২ থেকে ৩-এর মধ্যে ১২৭ জন এবং ২-এর নিচে রয়েছেন ৯৫ জন শিক্ষক।
সর্বোচ্চ ১৩৫টি রিভিউ পাওয়া ফিন্যান্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী গোলাম রব্বানী মওলা ৪.৯০ রেটিং পেয়েছেন। এ ছাড়া একই বিভাগের অধ্যাপক শবনাজ আমিন ৪.৮৭, ইংরেজি বিভাগের নিশাত আতিয়া শৈলী ৪.৮৭, ফিন্যান্স বিভাগের মো. ইমরান হোসেন ৪.৯৬, দর্শন বিভাগের মোহাম্মদ ওয়াহিদুল আলম ৪.৯৩ এবং মার্কেটিং বিভাগের মো. তানভীর আলম হিমেল ৪.৯৮ রেটিং পেয়েছেন।
অন্যদিকে ফিন্যান্স বিভাগের মোছা. নুসরাত খান ১.২৭, ইংরেজি বিভাগের তাসনিম সিরাজ মাহবুব ১.১৯, লোকপ্রশাসন বিভাগের শেহরিন আমিন ভূঁইয়া ১.৪৯, পরিসংখ্যান বিভাগের নওশীন তাবাসসুম সোহানা ১.৪৫, মার্কেটিং বিভাগের আলী মো. কাউসার ১.৬৩ এবং ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের মো. খালেদ বিন আমির ১.০০ রেটিং পেয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যেও কারও রেটিং প্রকাশ হয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবাইদুল ইসলামের রেটিং ৪.৪৭ এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল মোজাদ্দেদী আলফেসানির ৪.৪৩। কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী পেয়েছেন ২.১৭ রেটিং।
ডাকসুর এ উদ্যোগ নিয়ে ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষক ও প্রশাসন। তাদের দাবি, শিক্ষক মূল্যায়ন ডাকসুর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। ডাকসু গঠনতন্ত্রেও শিক্ষক মূল্যায়নের দায়িত্বের কথা উল্লেখ নেই বলে জানান তারা।
একাধিক শিক্ষক বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি ব্যবস্থা। বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রশাসনিকভাবে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হয়। তবে ডাকসুর উদ্যোগে মূল্যায়নের ফল প্রকাশ্যে দেওয়ায় বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
শিক্ষকদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, একজন শিক্ষার্থী কোনো শিক্ষকের ক্লাস না করেও তাকে মূল্যায়ন করতে পারছেন। আবার রেটিং সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় বিষয়টি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত রয়েছে। তার মতে, নিয়মিত ক্লাস করা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীকে মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়ার আগে তার ক্লাসে অন্তত ৭৫ শতাংশ উপস্থিতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন প্রয়োজন এবং এর মাধ্যমে শিক্ষকদের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে উন্নতির সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। তবে এর মাধ্যমে কাউকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
শিক্ষকদের দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সালে শিক্ষক মূল্যায়নের নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ‘লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এলএমএস) চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে নানা কারণে সেটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা আগে চালুর উদ্যোগ থাকলেও তা সব বিভাগে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। প্রশাসনের কাছে বারবার দাবি জানিয়েও কার্যকর ফল না পাওয়ায় ডাকসু নিজেদের উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি চালু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করলে ডাকসুর প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করছে। এর মধ্যে ডাকসু যে ব্যবস্থা চালু করেছে, তা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চূড়ান্ত নীতিমালা রয়েছে, যা একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হয়েছে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিতভাবে এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক মূল্যায়ন প্রচলিত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও বেশ কিছু বিভাগে এটি আগে থেকেই কার্যকর। তবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে চালুর ক্ষেত্রে যাতে কোনো অপব্যবহার বা অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষকদের বিষয়ে মূল্যায়ন নেওয়া হয়। তবে ডাকসুর মাধ্যমে এ ধরনের মূল্যায়ন নতুন ধরনের বিতর্ক তৈরি করতে পারে। তার মতে, শিক্ষক সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়ার একটি স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা অবশ্যই থাকা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ইউজিসি ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চিন্তাভাবনায় পার্থক্য রয়েছে। ডাকসুর উদ্যোগের মূল্যায়ন একপেশে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা কার্যকর করার পরামর্শ দেন তিনি।