আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : শনিবার ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর নানা উদ্যোগ ও আশ্বাসের মধ্যেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পিছিয়ে যাচ্ছেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের একটি অংশ। সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিনিয়োগের পরিবেশ স্থিতিশীল করতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব বা অর্থনৈতিক অঞ্চল চালুর ঘোষণা যথেষ্ট নয়। শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, দ্রুত ব্যবসায়িক অনুমোদন, পরিবহন ও লজিস্টিকস সুবিধা এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত না হলে বড় বিনিয়োগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
সম্প্রতি জেনেভায় জাতিসংঘের ইনভেস্টমেন্ট, এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমিশনের আলোচনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক উঠে আসে। সেখানে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে দেওয়া ৩২টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে ২৫টি বাস্তবায়িত হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ঘাটতির বিষয়ও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে সমন্বিত বিনিয়োগ নীতি ও আইন প্রণয়ন, ব্যবসায়িক অনুমোদন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটাল করা, অবকাঠামোর মানোন্নয়ন এবং দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জাতিসংঘের আলোচনায় বিদেশি বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) কার্যকর সংযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ বিদেশি বিনিয়োগ শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় সরবরাহকারী ও ব্যবসাগুলোর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রোচি জানিয়েছেন, নতুন বিনিয়োগের একটি বড় পাইপলাইন তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। সামনে আরও প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
তার প্রত্যাশা, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যক্রম শুরু করা এবং চীনে ইনভেস্ট বাংলাদেশের অফিস স্থাপনের পর দেশটি থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
তবে বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া আর সেই প্রস্তাব বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেওয়া—দুটি বিষয় এক নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা এলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে অনেক প্রকল্প আটকে যাওয়ার নজির রয়েছে। ফলে নতুন প্রস্তাবের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত ও সহজ সেবা নিশ্চিত করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
অন্যদিকে কয়েকটি দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগোলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির জন্য শুধু নীতিগত উদ্যোগ নয়, বাস্তব ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু বাজারের আকার দেখেন না। তিনি জ্বালানি সরবরাহ, জমি, অনুমোদন, করব্যবস্থা, ব্যাংকিং সুবিধা, পরিবহন ব্যয়, দক্ষ শ্রমিক এবং ব্যবসা পরিচালনার ঝুঁকিও বিবেচনা করেন।
নাহিয়ান রহমান রোচির মতে, বর্তমানে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি সরকারও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। সংকট মোকাবিলায় কিছু স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু উদ্যোক্তাদের কাছে প্রশ্ন হলো—নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত বিদ্যমান শিল্পগুলো কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালাবে?
কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং রপ্তানি—সবকিছুতেই প্রভাব পড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিনিয়োগের পথে শুধু জ্বালানি সংকটই নয়, অর্থায়নের সমস্যাও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। নীতি সুদহার কমানোর পরও ঋণবাজারে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি। ফলে উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণে অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের প্রবণতাও দীর্ঘ সময়ের মধ্যে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—একদিকে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি; এই দুই চাপের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে?
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সরকারই বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছে। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও দুর্নীতির মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো কমাতে হবে।
বিশেষ করে উৎপাদন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি উন্নত পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে অন্তত তিনটি বড় বাধা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থায়নের সংকট এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের জটিলতা।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। ফলে নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা এলেও তা দ্রুত বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বা নতুন এলএনজি টার্মিনাল নিঃসন্দেহে বিনিয়োগ পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এগুলোকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে দেখলে হবে না। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে জ্বালানি, অবকাঠামো, অর্থায়ন, প্রশাসনিক সেবা ও নীতির ধারাবাহিকতা—সবকিছুকে একই কৌশলের আওতায় আনতে হবে।
কারণ বিনিয়োগকারী শুধু সম্ভাবনার কথা শুনতে চান না; তিনি জানতে চান, কারখানা চালু করার পর আগামী পাঁচ, দশ বা পনেরো বছর ব্যবসা কতটা স্থিতিশীলভাবে পরিচালনা করতে পারবেন।
সেই নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারলেই বিনিয়োগের পাইপলাইন থেকে বাস্তব অর্থনীতিতে নতুন কারখানা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন আসবে। অন্যথায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগের লক্ষ্য ও আশ্বাস কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থেকে যাবে।