আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : বৃহস্পতিবার ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
পদ্মায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে আবারও তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। স্রোতের আঘাতে প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও নদীতীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভেঙে পড়ছে নদীর পাড়, আবার কোথাও দেখা দিয়েছে নতুন ফাটল। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পদ্মাপাড়ের মানুষের মধ্যে।
গত এক সপ্তাহ ধরে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায়। পাশাপাশি দৌলতদিয়া ইউনিয়নের লালু মন্ডল পাড়া, ১ নম্বর বেপারী পাড়া, নতুন পাড়া ও শাহ বেপারী পাড়া এলাকাতেও ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে।
ইতোমধ্যে নদীর পাড়ের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে বসতভিটা, মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান, হাটবাজার, বিদ্যালয় ও রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, দিনের বেলায় চোখের সামনে ভাঙন দেখলেও রাত নামলেই বাড়ে দুশ্চিন্তা। কখন বসতভিটা কিংবা জমি নদীগর্ভে চলে যায়—এই শঙ্কায় অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায় বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে। তীব্র স্রোতের সঙ্গে পাড়ে আছড়ে পড়ছে পানির ঢেউ। কোথাও বড় বড় ফাটল দেখা দেওয়ার পর হঠাৎ করেই মাটির অংশ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
ভাঙনকবলিত স্থানীয়রা জানান, পদ্মার পানি বাড়লেই নতুন করে ভাঙন শুরু হয়। ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে জিওব্যাগসহ নানা ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন না হওয়ায় স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এক বছর কোনো এলাকায় ভাঙন ঠেকানো গেলেও পরবর্তী বর্ষায় অন্য এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দেয়।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিওব্যাগ ফেলা নয়, নদীর গতিপথ ও স্রোতের চাপ বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থায়ী নদীশাসন করতে হবে।
মুন্সিবাজারের পাশাপাশি দৌলতদিয়া ইউনিয়নের লালু মন্ডল পাড়া, ১ নম্বর বেপারী পাড়া, নতুন পাড়া ও শাহ বেপারী পাড়াতেও ভাঙন ও ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে।
এসব এলাকায় নদীর কাছাকাছি রয়েছে মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি। কোথাও মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থান, আবার কোথাও রয়েছে হাটবাজার, বিদ্যালয় ও স্থানীয় সড়ক। ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় এসব স্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা অনেক সময় স্রোতের চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয় না। তাদের মতে, নদীর গতিপথ ও স্রোত বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী নদীশাসন করা না হলে প্রতি বছরই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি সমতল বর্তমানে ৭ দশমিক ২০ মিটার। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ৮ দশমিক ২০ মিটার। অর্থাৎ নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ১ মিটার নিচে রয়েছে।
তবে পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, সামনে পানি আরও বাড়লে ভাঙনের তীব্রতাও বাড়তে পারে।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বিভাগ জানিয়েছে, জেলার প্রায় ৩০টি স্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙনরোধে কাজও চলছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দা মহিরন নেছা বলেন, নদীভাঙনে এরই মধ্যে তার প্রায় দেড় বিঘা জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে ভাঙনের কারণে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। এখন নিজের শেষ সম্বলটুকুও হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন তিনি।
মহিরন নেছা বলেন, ‘ত্রাণ বা খাদ্য সহায়তা নয়, আমরা চাই স্থায়ী নদীশাসন। দ্রুত নদীভাঙন রোধ করা না গেলে আমার বাবার-চাচার কবর ও ছেলের কবরটিও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
পাড়ের বাসিন্দা কাউছার ফকীর বলেন, জন্মের পর থেকেই তারা পদ্মার ভাঙন দেখে আসছেন। বছরের পর বছর ভাঙতে ভাঙতে গোয়ালন্দের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দ্রুত কার্যকর নদীশাসনের উদ্যোগ না নিলে দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়াসহ আরও এলাকা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৭৫ বছর বয়সী বাসিন্দা কালাম বেপারী বলেন, নদীভাঙনে তাদের পরিবারের একাধিক কবরসহ বিস্তীর্ণ জমি হুমকির মুখে পড়েছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি নদীভাঙন দেখছেন। বর্তমানে একদিনেই কয়েক কাঠা জমি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। দ্রুত জিওব্যাগ ফেলা এবং কার্যকর নদীশাসনের দাবি জানান তিনি।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাজমিনুর রহমান বলেন, নতুন করে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে দেবগ্রামের মুন্সিবাজার ও দৌলতদিয়া এলাকায় ভাঙনের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানি বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘রাজবাড়ী জেলায় প্রায় ৩০টি স্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙনরোধে কাজ চলছে।’
তাজমিনুর রহমান জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ মিটার অংশে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে জিওব্যাগ দিয়ে প্রতিরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ভাঙনের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজও বেগবান করা হচ্ছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, পদ্মাপাড়ের মানুষের জন্য নদীভাঙন দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। নতুন করে মুন্সিবাজার এলাকায় ভাঙনের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে রয়েছে।
তিনি বলেন, পদ্মাপাড়ের অধিবাসী, বিশেষ করে গোয়ালন্দবাসীর এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে সঠিক ও কার্যকর সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নদীপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, ভাঙন আরও তীব্র হওয়ার আগেই জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি পদ্মার গতিপথ, স্রোত ও ভাঙনপ্রবণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।