তিন মাস নয়, ফের মাসে মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমার উদ্যোগ এনবিআরের

তিন মাস নয়, ফের মাসে মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমার উদ্যোগ এনবিআরের

তিন মাস নয়, ফের মাসে মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমার উদ্যোগ এনবিআরের

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান চালুর পর তা আবার পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, তিন মাসের পরিবর্তে আগের মতো প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ফিরতে পারে।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে একটি সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের পর আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা হতে পারে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে ভ্যাট আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে এনবিআরের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের সঙ্গে এনবিআরের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে ভ্যাট রিটার্ন জমার পদ্ধতি নিয়ে একটি ওয়ার্কিং পেপার তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রথম মাসেই ভ্যাট আদায়ে বড় ঘাটতি

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫২০ কোটি টাকা।

এ সময়ে ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধি গত এক যুগের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ কমে মাইনাস ২৬ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এর পরই ভ্যাট রিটার্ন জমার নতুন পদ্ধতি নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করে এনবিআর। ভ্যাট পলিসি বিভাগের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে একটি ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করেন। এরপর আগের নিয়মে মাসিক রিটার্ন জমার বিধান ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সারসংক্ষেপ তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তিন মাসের রিটার্নে প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কা

মাঠপর্যায়ের ভ্যাট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন মাসের তথ্য একসঙ্গে জমা পড়লে ভ্যাট সার্কেল অফিসগুলোর জন্য তা যাচাই-বাছাই ও অডিট করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তাদের মতে, প্রতি মাসে দাখিলপত্র যাচাই করে ভ্যাট ফাঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের কাজ করা হয়। তিন মাসের লেনদেনের তথ্য একসঙ্গে জমা পড়লে বিপুলসংখ্যক ট্রানজেকশন অডিট করতে প্রশাসনিক চাপ বাড়বে।

এ ছাড়া ভ্যাট বকেয়া বাড়লে তা আদায়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ, ডিমান্ড নোটিশ ও সার্টিফিকেট মামলা বাড়তে পারে। এতে রাজস্ব বিভাগের প্রশাসনিক ব্যয় ও মামলার জট উভয়ই বাড়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।

তাদের আরও বক্তব্য, ভোক্তাদের কাছ থেকে পণ্য বা সেবা বিক্রির সময় যে ভ্যাট আদায় করা হয়, তা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে দেরি হলে ওই অর্থ নির্দিষ্ট সময় ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে যায়। এতে সরকারের অর্থের সময়মূল্য হারানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

‘হুটহাট নীতি পরিবর্তন ঠিক নয়’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল। আবার তিন মাস না যেতেই আগের নিয়মে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগও নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

তার মতে, জাতীয় পর্যায়ের রাজস্বনীতি এভাবে অ্যাডহক ভিত্তিতে পরিবর্তন করা উচিত নয়। নতুন কোনো নীতি চালুর আগে বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সম্ভাব্য সমস্যা পর্যালোচনা করা জরুরি।

‘দুটি সিদ্ধান্তই সংশোধন করা প্রয়োজন’

এনবিআরের ভ্যাট পলিসির সাবেক সদস্য ও বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরামের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুর রউফ বলেন, অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

তার মতে, এক মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর ভ্যাট দাখিলপত্র জমা দেওয়াকে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে দেখাটা ছিল অতিসরলীকরণ। যেসব ক্ষেত্রে দাখিলপত্রের সঙ্গে সরাসরি রাজস্বের সংশ্লিষ্টতা নেই, সেসব ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার সময় বাড়ানো ব্যবসাবান্ধব হতে পারে। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে রিটার্নের সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, সেখানে সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ঠিকাদার, জোগানদার ও সিঅ্যান্ডএফ সেবার ক্ষেত্রে আগে ছয় মাস অন্তর দাখিলপত্র জমার সুযোগ ছিল। এসব ক্ষেত্রে দাখিলপত্রের সঙ্গে সরাসরি রাজস্বের সংশ্লিষ্টতা না থাকায় সময়সীমা বাড়ানো যৌক্তিক ছিল। কিন্তু এবার সেটিও বাতিল করা হয়েছে।

তার মতে, রাজস্ব আদায় ও ব্যবসাবান্ধব নীতির মধ্যে ভারসাম্য আনতে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো সংশোধন করা প্রয়োজন।

সংসদে উঠতে পারে প্রস্তাব
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভ্যাট রিটার্ন জমাসংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রস্তাবটি সংসদে উপস্থাপন করা হতে পারে।