জেলা শহরে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলবাস চালুর উদ্যোগ, প্রস্তাব ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার

জেলা শহরে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলবাস চালুর উদ্যোগ, প্রস্তাব ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার

সংগৃহীত

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াত নিশ্চিত করতে দেশের বড় জেলা শহরগুলোতে স্কুলবাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পিত এ পরিবহন ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি যানজট ও পরিবহন ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ‘বৃহৎ জেলা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা প্রকল্প’ নামে ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে মাউশি জানিয়েছে, উদ্যোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচ বছর। আগামী ১ জুলাই থেকে ২০৩২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যয়ে ১৫৯ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ২০ কোটি, মোটরযান ক্রয়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি, কম্পিউটার সরঞ্জাম ক্রয়ে ৫১ কোটি এবং বিবিধ খাতে ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে ১৩ সিটি করপোরেশনে

প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে প্রথম পর্যায়ে ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকায় স্কুলবাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো হলো—ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া।

পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীদের জন্য জিপিএস সুবিধাসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস চালুর কথা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বসবাসের স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও যাতায়াতের চাহিদা বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট রুট ও স্টপেজ নির্ধারণ করা হবে। বাসের অবস্থান ও চলাচল পর্যবেক্ষণে জিপিএস, স্মার্টকার্ড ও অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্ভাব্যতা যাচাই হবে

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, সেবাটি চালুর আগে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের চাহিদা, বিদ্যমান গণপরিবহনব্যবস্থা, সম্ভাব্য রুট, ব্যস্ততম সময়, পরিবহন ব্যয় ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা বিশ্লেষণ করা হবে। এ জন্য প্রায় ৩৩ কোটি টাকার পৃথক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কার্যকর ফল পাওয়া গেলে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের পর মূল প্রকল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মাউশির পরিচালক অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীনও জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

কেন এই উদ্যোগ

মাউশির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় জেলা শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এখনো মূলত সাধারণ গণপরিবহন, রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যানসহ ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার ব্যস্ত সময়ে অতিরিক্ত ভিড়, যানজট, অনিয়মিত পরিবহন ও বাড়তি ভাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তিতে ফেলে।

বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াতের সুযোগ নিশ্চিত করাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। পরিকল্পিত স্কুলবাস চালু হলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের অনিশ্চয়তা কমার পাশাপাশি অভিভাবকদের সময় ও পরিবহন ব্যয়ও কমতে পারে।

পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে। পাশাপাশি বাস পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ওঅ্যান্ডএম) মডেল তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আগেও ব্যর্থ হয়েছিল স্কুলবাস উদ্যোগ

শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলবাস চালুর উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১০ সালে রাজধানীতে বিআরটিসির মাধ্যমে স্কুলবাস সেবা চালু করা হয়েছিল। তবে পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় আয়-ব্যয়ের বড় ঘাটতি তৈরি হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সেবা বন্ধ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্টদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে স্কুলবাস চালুর আরেকটি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি রুট নির্ধারণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাস শুরুর সময় প্রায় একই হওয়ায় একই সময়ে বিপুল শিক্ষার্থীকে পরিবহন করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাসে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এ কারণে নতুন উদ্যোগ সফল করতে রুট নির্ধারণ, বাসের সংখ্যা, ভাড়া, সময়সূচি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচির মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, ‘বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে কি না, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।’