আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : শুক্রবার ১১ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
ছোট ব্যবসায়ও মাসিক ভ্যাটের পরিকল্পনা, ইউনিয়নে ৫০০ থেকে জেলায় ২ হাজার টাকা
দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন ছোট দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যবসার ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভ্যাট দিতে হতে পারে।
এনবিআরের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর শহর এলাকায় ২ হাজার টাকা হারে ভ্যাট নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব হার এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ জন্য ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের বাজার, বিপণিবিতান ও দোকানের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
কোন এলাকায় কতটি দোকান রয়েছে, দোকানগুলোর ধরন কী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান কোথায়—এসব তথ্যের পাশাপাশি ব্যবসার ধরন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও একই ধরনের তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংগৃহীত এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত ভ্যাটের আওতায় আনা হবে, তা চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এনবিআরের সংগৃহীত একটি তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নুর নাহার প্লাজায় ৫২টি দোকান রয়েছে। এসব দোকানের মধ্যে চারটিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি রয়েছে।
অন্যদিকে রংপুর সিটির বেতপট্টি বাজারে দোকানের সংখ্যা ১২১টি। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার রৌমারী বাজারে রয়েছে ৫০টি দোকান।
দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজার, বিপণিবিতান ও দোকান সম্পর্কে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের পর একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ বা তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রান্তিক পর্যায়ে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও ধরন সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে বলে মনে করছে এনবিআর।
প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিজিটাল পদ্ধতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে এনবিআরের।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের যাতে ভ্যাট দিতে গিয়ে জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়তে না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ কাজে আলাদা একটি অ্যাপ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থাৎ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দোকানদার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে নির্ধারিত ভ্যাট পরিশোধের জন্য সরাসরি কোনো অফিসে গিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরিবর্তে ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত ৫০০, ১ হাজার ও ২ হাজার টাকা এখনো চূড়ান্ত হার নয়। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ধরন বিশ্লেষণের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কোন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে, সেটিও আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তালিকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, উপজেলা পর্যায়ের বাজার, বিপণিবিতান ও দোকানের তালিকা ইতোমধ্যে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে আসতে শুরু করেছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও তথ্য সংগ্রহ চলছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের পর ভ্যাটের নির্ধারিত হার চূড়ান্ত করা হবে।
প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের ভ্যাট চালুর এ উদ্যোগ নতুন হলেও এর সঙ্গে আগের প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থার কিছুটা মিল রয়েছে।
প্রায় এক দশক আগে শহরাঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভ্যাট দিতে হতো। ওই ব্যবস্থা ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ নামে পরিচিত ছিল।
তবে ২০১৯ সালে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এবার এনবিআরের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অনেকটা একই ধরনের কাঠামোয় ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায়ের নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত অঙ্কের ভ্যাট দিতে হতে পারে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য।
অন্যদিকে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার নিচে, তাদের জন্য ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়।
এ অবস্থায় ভ্যাট ব্যবস্থার আওতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এর ফলে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ব্যবসাগুলোকেও রাজস্ব ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট খাত থেকে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে।
এই বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণ করা গেলে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছে এনবিআর। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন আর্থিক চাপ তৈরি হবে কি না, নির্ধারিত হার তাদের ব্যবসার সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কি না—এসব বিষয়ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এনবিআরের পক্ষ থেকে প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ধারিত হারে ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা করা হলেও এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ধরন ও অবস্থান বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। একই সঙ্গে সহজ ডিজিটাল পরিশোধ ব্যবস্থা চালু হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট দেওয়ার প্রক্রিয়াও তুলনামূলক সহজ করার চেষ্টা থাকবে এনবিআরের।