আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
বর্তমানে পৃথিবীতে দেড় হাজারের বেশি প্রজাতির বাদুড় রয়েছে। বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই উড়ুক্কু স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিবর্তনের ইতিহাস অবশ্য এতদিনও অনেকটাই রহস্যে ঢাকা ছিল। এবার বাদুড়ের জিনোম ও জীবাশ্ম নিয়ে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় যৌথ গবেষণায় তাদের উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার ফলাফল বলছে, ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়ার পরপরই প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে ইউরোপে বাদুড়ের পূর্বপুরুষদের উদ্ভব ঘটে থাকতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে এসব উড়ুক্কু স্তন্যপায়ী প্রাণী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে উত্তর আমেরিকা, এশিয়া কিংবা আফ্রিকায় বাদুড়ের উৎপত্তি হয়েছিল বলে ধারণা করা হতো। নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
গবেষণায় ২১টি স্বীকৃত পরিবারের ১০৩টি প্রজাতির বাদুড়ের জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ৪৪টি জীবাশ্ম বাদুড়ের তথ্যও যুক্ত করেন গবেষকেরা। বিপুল পরিমাণ জিনোম ও জীবাশ্মের তথ্য একত্র করে বাদুড়ের বিবর্তনীয় ইতিহাসের একটি বিস্তারিত পারিবারিক বৃক্ষ তৈরি করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে একটি গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীতে ব্যাপক প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংসের পর প্রায় ১০ লাখ বছর পেরিয়ে ইউরোপে বাদুড়ের আবির্ভাব ঘটে। ওই মহাবিপর্যয়ের পর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য নতুন পরিবেশগত সুযোগ তৈরি হয় এবং তারা পৃথিবীর বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে দ্রুত বিস্তার লাভ করতে থাকে।
গবেষণায় বাদুড়ের উড্ডয়নের পাশাপাশি ইকোলোকেশন বা প্রতিধ্বনির মাধ্যমে পথ ও শিকার শনাক্ত করার ক্ষমতার বিবর্তন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, বাদুড়ের বিবর্তনের শুরুর দিকেই এই দুই বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছিল।
ইকোলোকেশনের মাধ্যমে বাদুড় উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে এবং সেই শব্দের প্রতিধ্বনি শুনে আশপাশের বস্তু ও শিকারের অবস্থান শনাক্ত করে। রাতে শিকার করার ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা তাদের বড় সুবিধা দিয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করছেন। এর ফলে দিনের বেলায় সক্রিয় পাখিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এড়িয়ে রাতের পরিবেশে নতুন বাস্তুসংস্থানীয় ভূমিকা তৈরি করতে পেরেছে বাদুড়।
তবে কোনটি আগে বিবর্তিত হয়েছিল—উড্ডয়ন নাকি ইকোলোকেশন—এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। গবেষকদের মতে, এর উত্তর পেতে বাদুড়ের আরও প্রাচীন ‘প্রি-ব্যাট’ বা রূপান্তরধর্মী জীবাশ্ম প্রয়োজন।
বাদুড় শুধু উড়তে সক্ষম প্রাণী হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা গাছপালার পরাগায়নে সহায়তা করে, বীজ ছড়িয়ে দেয় এবং বিপুল পরিমাণ পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
পৃথিবীর ইতিহাসে উড়তে সক্ষম মেরুদণ্ডী প্রাণীর মাত্র তিনটি বড় গোষ্ঠীর একটি হলো বাদুড়। পাখি ও বিলুপ্ত উড়ন্ত সরীসৃপ প্টেরোসরদের পাশাপাশি বাদুড়ই মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সক্রিয়ভাবে উড়তে সক্ষম গোষ্ঠী। বর্তমানে অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশেই বাদুড়ের বসতি রয়েছে। তারা বিশ্বের মোট স্তন্যপায়ী প্রজাতির এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো বাদুড়ের জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বছর। নতুন গবেষণায় জিনোম ও শারীরিক গঠনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এর চেয়েও আগের—প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে—বাদুড়ের উৎপত্তির সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, বাদুড়ের বিবর্তন বোঝার পাশাপাশি এ গবেষণা বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তনের পর কীভাবে নতুন প্রাণীগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটে, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। ভবিষ্যতে বাদুড়ের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, দীর্ঘায়ু ও বার্ধক্য প্রতিরোধের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণার সুযোগ তৈরি হতে পারে।