এআইয়ের ভুল গোয়েন্দা তথ্য, চীনের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

এআইয়ের ভুল গোয়েন্দা তথ্য, চীনের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

সংগৃহীত

এআইয়ের সহায়তায় তৈরি একটি ভুল গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেছে সিএনএন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্রের বরাতে এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে দাবি করা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত একটি চীনা জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির উপকরণ পরিবহন করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর জাহাজটি আটকানোর পরিকল্পনা করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। চার সূত্রের মধ্যে দুজন জানান, জাহাজে ওঠার জন্য সশস্ত্র মার্কিন সেনারা প্রস্তুত ছিলেন। আরও দুই সূত্রের দাবি, এ সময় সামরিক বিমানও আকাশে অবস্থান করছিল।

তবে অভিযান শুরুর ঠিক আগে কর্মকর্তারা প্রতিবেদনে থাকা তথ্য আরও গভীরভাবে যাচাই করেন। তখন তারা জানতে পারেন, বিশেষ অভিযান কমান্ডের একজন বিশ্লেষক এআইয়ের সহায়তায় প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলেন। পরে যাচাই করে দেখা যায়, জাহাজে থাকা পণ্য সম্পর্কে এআইয়ের দেওয়া তথ্য সঠিক ছিল না।

জাহাজটিতে আসলে কী ধরনের পণ্য ছিল, তা সিএনএন নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র এআই-নির্ভর প্রতিবেদনটিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, ভুল তথ্যটি ‘প্রায় একটি যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল’।

চীনা একটি জাহাজের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালিত হলে তা দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।

কীভাবে তৈরি হলো ভুল তথ্য

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজটির পণ্য তালিকা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের সময় সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক একটি এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেন। এসব তথ্যের একটি অংশ এসেছিল হাওয়াইভিত্তিক ইউএস স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড প্যাসিফিক থেকে।

চ্যাটবটটি সরকারি সংরক্ষণে থাকা গোপন সংকেতভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে উন্মুক্ত উৎসের তথ্য মিলিয়ে জাহাজের পণ্য সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। পরে ওই বিশ্লেষক এআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যগুলোকে প্রচলিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কাঠামোয় সাজান।

সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে বিবেচিত ওই প্রতিবেদনটি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থা বাণিজ্যিক কোনো চ্যাটবট ছিল নাকি মার্কিন সরকারের নিজস্ব প্রযুক্তি, তা স্পষ্ট নয়।

ঘটনাটি নিয়ে মন্তব্য চেয়ে সিএনএনের পক্ষ থেকে ইউএস স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড প্যাসিফিক ও পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।

সামরিক বাহিনীতে বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার

মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, রসদ সরবরাহ ও সরবরাহব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের চেষ্টা করছে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীনসহ সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সংঘাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টিও এআই ব্যবহারের অন্যতম কারণ।

জানুয়ারিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক বাহিনীতে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাক্সেলারেশন স্ট্র্যাটেজি’ প্রকাশ করেন। এর লক্ষ্য ছিল আমলাতান্ত্রিক বাধা কমিয়ে সামরিক বাহিনীতে এআইয়ের পরীক্ষামূলক ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রায় ৩০ লাখ বেসামরিক ও সামরিক কর্মীর কাছে এআই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া।

তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এ উদ্যোগ অনেকটাই বিকেন্দ্রীভূত। সরকারের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন এআই ব্যবস্থা, নির্দেশনা ও নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি তথ্য কীভাবে যাচাই করা হবে, সে বিষয়ে পুরো সামরিক বাহিনীর জন্য একক কোনো মানদণ্ডও নেই।

লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআই নিয়ে উদ্বেগ

এআইয়ের ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। চীনা জাহাজের ঘটনাটি সামরিক ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের আরও বড় ঝুঁকি সামনে এনেছে—বিশেষ করে এআইয়ের তৈরি ভুল তথ্যের ভিত্তিতে যদি যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। এতে ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, বেসামরিক হতাহত কিংবা নিজেদের বাহিনীর ওপর ভুল হামলার মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মার্কিন সামরিক নীতির সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র বলেন, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় মানুষের তদারকি কীভাবে বেসামরিক হতাহত বা নিজেদের বাহিনীর ওপর ভুল হামলা ঠেকাবে, সে বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত নির্দেশনা নেই।

গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের এক সূত্রের দাবি, এআইয়ের তৈরি এমন ‘হ্যালুসিনেশন’ বা বাস্তবতাবিবর্জিত তথ্যের ঘটনা শুধু একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

পুরোনো প্রজন্মের কিছু গোয়েন্দা কর্মকর্তা এআই ব্যবহারের পক্ষে থাকলেও তাদের কেউ কেউ মনে করেন, দ্রুত গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার চাপ বিশ্লেষকদের ভুলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কয়েকটি সূত্রের মতে, প্রযুক্তিতে বেশি অভ্যস্ত তরুণ বিশ্লেষকরা কখনো কখনো এআইয়ের দেওয়া তথ্য যথেষ্ট যাচাই না করেই বিশ্বাস করতে পারেন।