আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : বৃহস্পতিবার ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সংগৃহীত
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব প্রস্তাব দেন।
‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: অ্যা রিনিউড কল ফর অ্যা ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও সমাধান খোঁজার দিকে, প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এর অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাব হলো—
প্রথমত, প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ: রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি মিয়ানমারের ভেতরে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
দ্বিতীয়ত, সহিংসতা বন্ধ ও অধিকার নিশ্চিত: রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা ফিরে পান।
তৃতীয়ত, মানবিক সহায়তা বাড়ানো: রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা দিতে হবে। তাদের উদার আতিথেয়তার কারণে স্থানীয় জনগণের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
চতুর্থত, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি: টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে অপরিহার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।
পঞ্চমত, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন: এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখা মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার তাগিদে সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। বর্তমানে তাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুরা মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা পাচ্ছে। তরুণদের সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়নেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের জন্য শিবিরগুলো আদর্শ স্থান নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা মানবপাচার, অভিবাসী পাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন।
রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য নির্ধারিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে, অনির্দিষ্টকাল এই দায়িত্ব কেবল বাংলাদেশের ওপর বহন করার প্রত্যাশাও করা যায় না।
রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, মিয়ানমারে কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল ও পরবর্তী সময়ে ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন প্রত্যক্ষ করেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর সংকট আরও গভীর হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ পালিয়ে আসছে এবং শিবিরগুলোতে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রাখতে চায় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারে, সেটিই বাংলাদেশের প্রত্যাশা। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশ তাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে এ উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।